সিক্রেট অব সিক্রেটস: বিজ্ঞানের মোড়কে আধ্যাত্মিকতা
রবার্ট ল্যাংডন সিরিজ বা এই লেখকের বই মানেই পাঠকের মনে এক অন্যরকম উত্তেজনা কাজ করে। বিশেষ করে লেখকের আগের বই "অরিজিন" পড়ার পর আমার প্রত্যাশা অনেক হাই ছিল। যদিও পাঠকমহলে "দ্য ভিঞ্চি কোড" সবচাইতে বেশি জনপ্রিয়, কিন্তু আমার ব্যক্তিগত তালিকায় অরিজিনই সেরা। কারণ, অরিজিনে বিজ্ঞানের যে শক্ত ভিত্তি, যৌক্তিক ব্যাখ্যা এবং উপস্থাপনা ছিল, তা এক কথায় অসামান্য এবং গ্রহণযোগ্য। সেই মুগ্ধতা থেকেই অনেক আশা নিয়ে "সিক্রেট অব সিক্রেটস" বইটি হাতে নিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ করার পর অনুভূতিটা ঠিক আগের মতো হলো না।
গল্পের প্রেক্ষাপট
বইটির মূল কাহিনী আবর্তিত হয়েছে নোয়েটিক সায়েন্স বা মানব চেতনার রহস্যময় জগতকে কেন্দ্র করে। গল্পের পটভূমি রহস্যঘেরা প্রাগ শহর। প্রফেসর ল্যাংডন সেখানে যান তার পরিচিত নোয়েটিক বিজ্ঞানী ক্যাথারিন সলোমনের একটি বিশেষ বক্তৃতা শুনতে। ক্যাথারিন দাবি করেন, তিনি এমন কিছু আবিষ্কার করেছেন যা মানব চেতনা সম্পর্কে আমাদের চিরাচরিত ধারণা বদলে দেবে। কিন্তু হঠাৎ একটি নৃশংস খুন এবং ক্যাথারিনের গবেষণার লিপি গায়েব হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় আসল নাটকীয়তা। ল্যাংডনকে নামতে হয় এক জটিল ধাঁধার সমাধানে। প্রাচীন প্রতীক, গুপ্ত সুড়ঙ্গ এবং স্থাপত্যের রহস্য ভেদ করে তাকে এগোতে হয়।
যা ভালো লেগেছে
বইটির বিষয়বস্তুর মধ্যে একটা দার্শনিক গভীরতা আছে। লেখক দেখানোর চেষ্টা করেছেন, বিজ্ঞান যত গভীরে যাচ্ছে, ততই তা আধ্যাত্মিকতার কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছে। আমাদের আত্মা বা কনশাসনেসের কোনো দৃশ্যমান বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই মানেই যে তার অস্তিত্ব নেই, তা জোর দিয়ে বলা যায় না। যুক্তির বাইরেও একটা জগত থাকতে পারে। প্রমাণের অনুপস্থিতি মানেই অনুপস্থিতির প্রমাণ নয়।
কেন প্রত্যাশা পূরণ হলো না?
বইটি পড়ে আমার কাছে বেশ কিছু জায়গায় অসঙ্গতি মনে হয়েছে:
১. অতিরিক্ত দৈর্ঘ্য ও বর্ণনা: বইটি একটু বেশি দীর্ঘ। লেখকের অতিরিক্ত বর্ণনার প্রবণতা গল্পের গতি কমিয়ে দিয়েছে। অনেক জায়গায় মনে হয়েছে, এই অংশটুকু না থাকলেও মূল কাহিনীতে কোনো প্রভাব পড়ত না।
২. বিজ্ঞানের নামে আধ্যাত্মিকতা: আমার কাছে মনে হয়েছে, ব্রাউন এই বইয়ে বিজ্ঞানের মোড়কে মূলত আধ্যাত্মিকতাই প্রচার করেছেন। "অরিজিন" এ যেমন শক্ত সায়েন্টিফিক লজিক ছিল, এখানে তার বড্ড অভাব। বইয়ের নামের সাথে ভেতরের বস্তুর মিল খুব কম। আত্মা, মৃত্যু পরবর্তী জীবন, এগুলো নিয়ে মানুষ হাজার বছর ধরে ভাবছে। এখানে কোনো নতুন 'সিক্রেট' বা গোপন তথ্য নেই।
৩. পুরনো ধারণার পুনরাবৃত্তি: লুসিড ড্রিমিং বা আমরা সবাই একে অপরের সাথে কানেক্টেড, এই কনসেপ্টগুলো এখন আর নতুন নয়। ইন্টারনেটে, টেডএক্স টকে বা বিভিন্ন ফিলোসফিক্যাল বইয়ে এই বিষয়গুলো নিয়ে প্রচুর আলোচনা আছে। আমি আশা করেছিলাম লেখক এমন কোনো শক্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য দেবেন যা সাধারণ মানুষ বা একজন বিজ্ঞানমনস্ক পাঠক যৌক্তিকভাবে মেনে নেবে। কিন্তু বইয়ের বেশিরভাগ গবেষণাকেই সচেতন পাঠকরা ‘স্যুডো সায়েন্স’ বলে উড়িয়ে দিতে পারেন।
শেষ কথা
সবমিলিয়ে, এই বইটিতে আমি তেমন একটা নতুন কিছু পাইনি। তবে আমি লেখককে ভুল বুঝছি না। আমাদের জানার সীমাবদ্ধতা আছে, মহাবিশ্বের সব রহস্য হয়তো বিজ্ঞানের ল্যাবে প্রমাণ করা সম্ভব নয়। লেখকের এই কথাগুলো হয়তো আজ কল্পবিজ্ঞান মনে হচ্ছে, কে জানে ভবিষ্যতে হয়তো এর কোনোটা সত্যিও হতে পারে!
মৃত্যুর পরের জগত আমাদের অজানা, আর আমার মনে হয় এটা অজানা থাকাই ভালো। কিছু রহস্য থাকুক, কিছু সীমাবদ্ধতা থাকুক, এটাই তো জগতের সৌন্দর্য। যারা হার্ডকোর সায়েন্স ফিকশন বা খুব ফাস্ট পেসড থ্রিলার পছন্দ করেন, তাদের কাছে এটি কিছুটা একঘেয়ে লাগতে পারে। তবে আপনি যদি আধ্যাত্মিকতা এবং বিজ্ঞানের একটা দার্শনিক মিশেল পছন্দ করেন, তাহলে একবার পড়ে দেখতে পারেন।
র্যাটিং : ৩/৫
