দ্য সোশ্যাল অ্যানিমেল

The Social Animal

আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, কেন একজন ধূমপায়ী জেনেশুনেও বিষপান করে? অথবা কেন আমরা কোনো দলে ভিড়লে নিজের বিচারবুদ্ধি হারিয়ে ফেলি? আমরা নিজেদের যৌক্তিক প্রাণী বলে দাবি করি। কিন্তু বিখ্যাত সমাজ মনোবিজ্ঞানী এলিয়ট অ্যারনসন তাঁর কালজয়ী বই 'দ্য সোশ্যাল অ্যানিমেল' এ আমাদের এই ধারণাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন।

আজ এই বইয়ের গভীর কিছু মনস্তাত্ত্বিক সূত্র নিয়ে আলোচনা করব, যা আপনাকে নিজের এবং সমাজের আচরণকে নতুনভাবে দেখতে শেখাবে।

১. অ্যারনসনের প্রথম সূত্র: পাগল নাকি পরিস্থিতির শিকার?

বইটির সবচেয়ে শক্তিশালী বাক্যটি হলো:

People who do crazy things are not necessarily crazy.

আমরা যখন কাউকে খারাপ বা অদ্ভুত কাজ করতে দেখি, আমরা চট করে বলে ফেলি "লোকটার চরিত্রই খারাপ" বা "সে মানসিকভাবে অসুস্থ"। সাইকোলজির ভাষায় একে বলা হয় Fundamental Attribution Error। অ্যারনসন বলেন, মানুষের আচরণের পেছনে তার ব্যক্তিত্বের চেয়ে পরিস্থিতির প্রভাব অনেক বেশি। একজন শান্ত মানুষও যদি প্রচণ্ড সামাজিক চাপে পড়ে, সে সহিংস হয়ে উঠতে পারে। তাই কাউকে বিচার করার আগে তার পরিস্থিতির দিকে তাকানো জরুরি।

২. আমরা যৌক্তিক নই, আমরা অজুহাত-প্রিয় 

মানুষ যুক্তিবাদী নয়, বরং মানুষ হলো আত্মপক্ষ সমর্থনকারী।

আমাদের মস্তিষ্ক সব সময় চায় নিজেকে সঠিক প্রমাণ করতে। যখন আমাদের বিশ্বাস এবং কাজের মধ্যে সংঘাত তৈরি হয়, তখন আমরা এক ধরণের মানসিক অস্বস্তি অনুভব করি। একে বলা হয় কগনিটিভ ডিসোন্যান্স।

উদাহরণস্বরূপ: একজন ব্যক্তি জানেন ধূমপান ক্যান্সারের কারণ (বিশ্বাস), কিন্তু তিনি ধূমপান করছেন (কাজ)। এই দুইয়ের বিরোধ মেটানোর জন্য তিনি ধূমপান ছাড়েন না, বরং নিজের বিশ্বাস বদলে ফেলেন। তিনি বলতে শুরু করেন, "ধূমপান করলে আমার টেনশন কমে" বা "অল্প কদিন বেঁচে থেকে লাভ কী?"। অর্থাৎ, আমরা সত্যকে মেনে নিই না, বরং নিজের ভুল কাজকে জাস্টিফাই করার জন্য নতুন সত্য তৈরি করি।

৩. কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে? 

আমরা সেই জিনিসটাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, যেটা পাওয়ার জন্য আমাদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট করতে হয়েছে।

ধরুন, আপনি খুব সহজেই একটি ক্লাবের মেম্বার হলেন। সেই ক্লাবের প্রতি আপনার খুব একটা মায়া থাকবে না। কিন্তু যদি সেই ক্লাবে ঢুকতে আপনাকে অপমানিত হতে হয় বা কঠোর পরিশ্রম করতে হয়, তবে আপনার মস্তিষ্ক আপনাকে বোঝাবে "নিশ্চয়ই এই ক্লাবটি খুব স্পেশাল, নইলে আমি কেন এত কষ্ট করলাম?" একেই বলা হয় Effort Justification। আমাদের জীবনের অনেক ব্যর্থ সম্পর্ক বা ভুল ক্যারিয়ার আঁকড়ে ধরে রাখার পেছনের কারণও এটাই, আমরা মেনে নিতে পারি না যে আমাদের এত কষ্টের ফল শূন্য।

৪. দলকানা স্বভাব 

কেন আমরা অন্যায় দেখেও চুপ থাকি? কেন ভিড়ের মধ্যে কেউ বিপদে পড়লে আমরা ভাবি "অন্য কেউ সাহায্য করবে"? একে বলা হয় বাইস্ট্যান্ড ইফেক্ট।

মানুষ সামাজিকভাবে খুবই প্রভাবিত হয়। আমরা একা ভুল হতে রাজি আছি, কিন্তু সবার থেকে আলাদা হয়ে সঠিক হতে ভয় পাই। আমরা দলের অংশ হয়ে থাকার জন্য নিজের নৈতিকতাকে বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত থাকি। এটি কোনো দুর্বলতা নয়, এটি আমাদের বিবর্তনের অংশ। কিন্তু একজন সচেতন মানুষ হিসেবে আমাদের উচিত এই "ভেড়ার পাল" থেকে বেরিয়ে এসে নিজস্ব বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করা।

শেষ কথা: আয়নায় নিজেকে দেখা

'দ্য সোশ্যাল অ্যানিমেল' কেবল একটি বই নয়, এটি মানুষের মনের আয়না। এই বইটি আমাদের শেখায় যে, আমরা যতটা স্বাধীন ভাবি, আমরা ততটা স্বাধীন নই, আমরা আমাদের পরিবেশ, সমাজ এবং নিজের তৈরি অজুহাতের দাস।

স্বউন্নতির প্রথম ধাপ হলো নিজের এই সীমাবদ্ধতাগুলো স্বীকার করা। পরের বার যখন আপনি কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন বা কারো আচরণ বিচার করবেন, নিজেকে প্রশ্ন করুন, আমি কি যুক্তিবাদী? নাকি আমি কেবল নিজের ইগোকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করছি?

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url