ঘুম: কেবল শরীরের বিশ্রাম নয়, মস্তিষ্কের এক গভীরতম সাইকোথেরাপি

Why We Sleep 

আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে ব্যস্ততাই সাফল্যের প্রতীক। আমাদের সংস্কৃতিতে কম ঘুমানোকে প্রায়শই কঠোর পরিশ্রম এবং ত্যাগের গৌরবময় উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়। "আমি মারা গেলে ঘুমানোর অনেক সময় পাব" এই জাতীয় বাক্য আমরা প্রায়ই শুনে থাকি। কিন্তু আমরা কি জানি, এই ঘুমকে অবহেলা করে আমরা আসলে নিজেদের অস্তিত্বের মূলে কুঠারাঘাত করছি?

প্রখ্যাত নিউরোসায়েন্টিস্ট এবং ঘুমের গবেষক ম্যাথিউ ওয়াকার তার সাড়া জাগানো বই 'Why We Sleep' এ একটি ভয়াবহ সত্য তুলে ধরেছেন: আধুনিক সমাজ এক গভীর 'ঘুম বঞ্চনার মহামারী'র মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

এই লেখাটি কেবল আপনাকে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়ার জন্য নয়। এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান, কীভাবে প্রতি রাতে বালিশে মাথা রাখার পর আমাদের মস্তিষ্কের ভেতরে এক অলৌকিক নিরাময় প্রক্রিয়া চলে, যা আমাদের মানসিক সুস্থতা, আবেগীয় স্থিতিশীলতা এবং বুদ্ধিমত্তার ভিত্তি তৈরি করে।

ঘুম: প্রকৃতির দেওয়া সেরা হেলথ ইন্স্যুরেন্স

ঘুম কোনো নিষ্ক্রিয় অবস্থা বা সময়ের অপচয় নয়। বরং, এটি একটি অত্যন্ত জটিল এবং সক্রিয় জৈবিক প্রক্রিয়া। ঘুম হলো প্রকৃতির দেওয়া একমাত্র এবং সবচেয়ে কার্যকরী চিকিৎসা ব্যবস্থা, যা আমাদের শরীর ও মনকে প্রতিদিন নতুন করে তৈরি করে।

আমাদের ঘুমের স্থাপত্য মূলত দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত, NREM (গভীর ঘুম) এবং REM (স্বপ্ন দেখার ঘুম)। আমাদের মানসিক সুস্থতার জন্য এই দুটির ভূমিকাই অপরিসীম।

মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা ১: ঘুম এবং আমাদের আবেগের লাগাম

আপনি কি লক্ষ্য করেছেন, যেদিন রাতে ঘুম ভালো হয় না, পরদিন সামান্য কারণেই মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় বা ছোটখাটো সমস্যাও অনেক বড় মনে হয়? এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর নিউরোসায়েন্স।

ঘুমের অভাব আমাদের মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী কেন্দ্র এবং যুক্তিবাদী কেন্দ্রের মধ্যকার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

অ্যামিগডালা: মস্তিষ্কের এই অংশটি আমাদের ভয়, রাগ এবং তীব্র আবেগের 'গ্যাস প্যাডেল' হিসেবে কাজ করে।

প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স: এটি হলো আমাদের মস্তিষ্কের যুক্তিবাদী অংশ, যা আবেগের 'ব্রেক' হিসেবে কাজ করে।

পর্যাপ্ত ঘুম না হলে এই 'ব্রেক' ঠিকমতো কাজ করে না। ফলে আমাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। এটি হলো আবেগীয় ভারসাম্যহীনতা। দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের অভাব আমাদের উদ্বেগ এবং বিষণ্ণতার দিকে ঠেলে দেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।

মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা ২: রাতের ফ্রি থেরাপি REM ঘুম 

বইটির সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশগুলোর একটি হলো REM (Rapid Eye Movement) বা স্বপ্ন দেখার ঘুমের বিশ্লেষণ। ওয়াকার REM ঘুমকে বলেছেন "Overnight Therapy" বা রাতের বেলার মানসিক চিকিৎসা।

সারাদিন আমরা যেসব কঠিন পরিস্থিতি, মানসিক চাপ বা ট্রমার মধ্য দিয়ে যাই, REM ঘুমের সময় মস্তিষ্ক সেগুলোর তীব্র আবেগীয় অংশটিকে ছেঁটে ফেলে এবং ঘটনাটিকে একটি সাধারণ স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করে। এটি অনেকটা ক্ষতস্থান থেকে কাঁটা বের করে মলম লাগানোর মতো।

যাদের REM ঘুম পর্যাপ্ত হয় না, তারা তাদের অতীত ট্রমা বা মানসিক আঘাত থেকে সহজে বের হতে পারেন না। অর্থাৎ, মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে এবং প্রতিদিনের স্ট্রেস সামলাতে স্বপ্ন দেখা অপরিহার্য।

মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা ৩: স্মৃতিশক্তি এবং সৃজনশীলতার ফ্যাক্টরি

আমরা অনেকেই পরীক্ষার আগে রাত জেগে পড়ি। কিন্তু এটি শেখার সবচেয়ে ভুল পদ্ধতি। ঘুম হলো মস্তিষ্কের 'সেভ বাটন'।

গভীর ঘুম (NREM): সারাদিনে আমরা যা শিখি, গভীর ঘুমের সময় তা মস্তিষ্কের অস্থায়ী মেমরি থেকে স্থায়ী মেমরিতে স্থানান্তরিত হয়।

স্বপ্ন ঘুম (REM): এই পর্যায়ে মস্তিষ্ক নতুন শেখা তথ্যের সাথে পুরনো স্মৃতির সংযোগ ঘটায়। একে বলা হয় সৃজনশীল সমস্যা সমাধান। অনেক সময় জটিল কোনো সমস্যার সমাধান আমরা ঘুম থেকে ওঠার পর হঠাৎ পেয়ে যাই, এর কারণ এই REM ঘুম।

সুতরাং, আপনি যদি মানসিকভাবে তীক্ষ্ণ এবং সৃজনশীল হতে চান, তবে ঘুমের বিকল্প নেই।

ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা: মস্তিষ্ক যখন আবর্জনা পরিষ্কার করতে পারে না

আমাদের মস্তিষ্কে সারাদিন কাজ করার ফলে কিছু বিষাক্ত প্রোটিন জমা হয়। এগুলো অ্যালঝেইমার্স রোগের জন্য দায়ী। ওয়াকার ব্যাখ্যা করেন, একমাত্র গভীর ঘুমের সময়ই মস্তিষ্কের 'গ্লিমফ্যাটিক সিস্টেম' সক্রিয় হয় এবং এই আবর্জনাগুলো পরিষ্কার করে।

বছরের পর বছর ঘুমের অভাব মানে মস্তিষ্কে এই বিষাক্ত পদার্থ জমতে দেওয়া, যা ভবিষ্যতে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

সুস্থতার পথে ফেরা: ওয়াকারের প্রেসক্রিপশন

ঘুমকে অবহেলা করা মানে নিজের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের সাথে জুয়া খেলা। সুস্থতার জন্য আমাদের ঘুমের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। এখানে কিছু বৈজ্ঞানিক 'স্লিপ হাইজিন' টিপস দেওয়া হলো:

  1. নিয়মানুবর্তিতাই বেস্ট: প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যান এবং একই সময়ে ঘুম থেকে উঠুন (এমনকি ছুটির দিনেও)। এটি আপনার জৈবিক ঘড়িকে ঠিক রাখে। 
  2. অন্ধকার এবং শীতল পরিবেশ: ঘুমের জন্য মেলাটোনিন হরমোন জরুরি, যা অন্ধকারে নিঃসৃত হয়। শোবার ঘর সম্পূর্ণ অন্ধকার এবং কিছুটা শীতল রাখুন। 
  3. ক্যাফেইন এবং নিকোটিন বর্জন: দুপুরের পর চা/কফি এড়িয়ে চলুন। ক্যাফেইনের প্রভাব শরীরে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত থাকতে পারে, যা গভীর ঘুমে বাধা দেয়। 
  4. নীল আলোকে 'না' বলুন: ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল, ল্যাপটপ বা টিভির স্ক্রিন থেকে দূরে থাকুন।

শেষ কথা 

ঘুম হলো আত্মপ্রেমের চূড়ান্ত রূপ। ঘুমকে আলস্য বা দুর্বলতা ভাবা বন্ধ করুন। বরং, একে দেখুন আপনার শরীর ও মনের প্রতি যত্ন নেওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে।

মানসিক প্রশান্তি, আবেগীয় স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘায়ু, সবকিছুর ভিত্তি হলো প্রতি রাতের একটি নিরবচ্ছিন্ন, গভীর ঘুম। আজ রাত থেকেই এই মহৌষধের সঠিক ব্যবহার শুরু করুন। আপনার মস্তিষ্ক আপনাকে ধন্যবাদ জানাবে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url