দ্য প্রিন্সিপালস অফ সাইকোলজি: আধুনিক মনোবিজ্ঞানের বাইবেল

The Principles of Psychology

মনোবিজ্ঞান মানেই সিগমুন্ড ফ্রয়েড আর অবচেতন মন, এইরকম একটা ধারণা আমাদের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু ফ্রয়েড বিখ্যাত হওয়ার আগেই, ১৮৯০ সালে আমেরিকায় এমন একটি বই প্রকাশিত হয়েছিল যা মনোবিজ্ঞানকে দর্শনশাস্ত্রের জট থেকে বের করে একটি স্বতন্ত্র বিজ্ঞান হিসেবে দাঁড় করিয়েছিল। বইটির নাম "The Principles of Psychology" এবং লেখক উইলিয়াম জেমস।

আজকের লেখায় আমরা এই বিশাল বইটির ৫টি এমন কনসেপ্ট নিয়ে আলোচনা করব, যা আজও মনোবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের জন্য অপরিহার্য।

১. চেতনার প্রবাহ 

উইলিয়াম জেমসের আগে মনে করা হতো আমাদের চিন্তাগুলো বুঝি ইটের মতো একটার পর একটা সাজানো থাকে। জেমস বললেন- না, চেতনা কোনো স্থির বস্তু নয়, এটি একটি নদীর মতো প্রবাহমান।

তিনি একে নাম দিলেন "Stream of Consciousness"। নদীর জল যেমন প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তিত হয়, আমাদের মনের অবস্থাও তাই। আপনি কখনোই হুবহু একই চিন্তা দুবার করতে পারেন না, কারণ দ্বিতীয়বার চিন্তাটি করার সময় আপনার পরিবেশ বা মানসিক অবস্থা বদলে গেছে। এটি অবিচ্ছিন্ন এবং ব্যক্তিগত, আপনার চিন্তা একান্তই আপনার।

২. আমি কে? 

জেমস আমাদের 'আমি' বা 'Self' কে খুব সুন্দরভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। তিনি বললেন, আমাদের 'সেলফ' এর প্রধানত তিনটি স্তর আছে:

বস্তুগত আমি: আপনার শরীর, আপনার পোশাক, পরিবার এবং আপনার টাকাপয়সা। জেমস বলেছিলেন, কারো টাকা হারিয়ে গেলে সে বিষণ্ণ হয় কারণ সে মনে করে তার সত্তার একটি অংশ কমে গেছে।

সামাজিক আমি: অন্যরা আপনাকে যেভাবে চেনে। জেমসের বিখ্যাত উক্তিঃ 

একজন মানুষের ততগুলো 'সোশ্যাল সেলফ' থাকে, যতজন মানুষ তাকে চেনে। আপনি আপনার মায়ের কাছে একরকম, আবার বন্ধুদের কাছে একদম অন্যরকম।

আত্মিক আমি: এটি আপনার একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতি, নৈতিকতা এবং বিবেক।

৩. আত্মসম্মানের সমীকরণ

মনোবিজ্ঞানে সম্ভবত উইলিয়াম জেমসই প্রথম আত্মসম্মান বা Self-Esteem পরিমাপের একটি গাণিতিক সূত্র দিয়েছিলেন। সূত্রটি দারুণ ইন্টারেস্টিং:

Self-Esteem = Success \ Pretensions

এর মানে হলো, আপনি যদি জীবনে সুখী হতে চান বা আত্মসম্মান বাড়াতে চান, তবে আপনার সামনে দুটি পথ খোলা: 

  1. নিজের সাফল্য বাড়িয়ে দিন। 
  2. অথবা, নিজের প্রত্যাশা কমিয়ে আনুন।

যে ছাত্র ক্লাসে ফার্স্ট হতে চায় সে সেকেন্ড হলে কষ্ট পায়, কিন্তু যে পাশ করতে চায় সে সেকেন্ড হলে আনন্দে আত্মহারা হয়। পুরোটাই প্রত্যাশার খেলা!

৪. অভ্যাস: সমাজের চাকা 

জেমস বিশ্বাস করতেন আমাদের মস্তিষ্ক প্লাস্টিক বা নমনীয়। তিনি অভ্যাসকে সমাজের বিশাল চাকা হিসেবে বর্ণনা করেছেন যা সমাজকে সচল রাখে।

অভ্যাস গঠনের জন্য তিনি শিক্ষার্থীদের কিছু কার্যকরি পরামর্শ দিয়েছিলেন:

শুরুটা হোক জোরালো: নতুন অভ্যাস গড়ার প্রথম দিনেই নিজের সবটুকু দিয়ে শুরু করুন।

কোনো ছাড় নয়: যতদিন না অভ্যাসটি পাকাপোক্ত হচ্ছে, একদিনের জন্যও ঢিলেমি দেবেন না। একটা সুতা গোছানোর সময় হাত ফসকে গেলে যেমন সবটুকু খুলে যায়, অভ্যাসের ক্ষেত্রেও তাই ঘটে।

আজই শুরু করুন: ভালো কিছু করার ইচ্ছা থাকলে তা এখনই করুন। শুধু ইচ্ছা বা ইনটেনশন কোনো কাজে আসে না যতক্ষণ না আপনি 'অ্যাকশন' নিচ্ছেন।

৫. জেমস-ল্যাঞ্জ থিওরি অফ ইমোশন 

এটি জেমসের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং মজাদার থিওরি। 

সাধারণ বুদ্ধি বলে: 

আমরা ভাল্লুক দেখি -> ভয় পাই -> দৌড় দেই।

কিন্তু জেমস এবং ল্যাঞ্জ বললেন উল্টো কথা: 

আমরা ভাল্লুক দেখি -> দৌড় দেই (শারীরিক প্রতিক্রিয়া) -> এবং তারপর ভয় পাই।

তাঁর মতে, আমাদের শারীরিক পরিবর্তনই আবেগের জন্ম দেয়। তিনি বলেছিলেন, আমরা কাঁদি তাই আমাদের মন খারাপ হয়, আমরা আঘাত করি তাই আমরা রাগান্বিত হই। এর ব্যবহারিক শিক্ষা হলো আপনি যদি মন ভালো করতে চান, তবে জোর করে হাসুন; শরীর হাসলে মনও হাসতে বাধ্য হবে।

শেষ কথা 

উইলিয়াম জেমসের "দ্য প্রিন্সিপালস অফ সাইকোলজি" শুধু একটি বই নয়, এটি মানব মনকে বোঝার এক বিশাল মানচিত্র। ১৩০ বছর পরেও এর গুরুত্ব কমেনি। সাইকোলজি স্টুডেন্টদের জন্য মাস্ট রিকমান্ডেড একটি বই।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url