নোটস ফ্রম আন্ডার গ্রাউন্ড
ফিয়োদর দস্তয়েভস্কির "নোটস ফ্রম আন্ডার গ্রাউন্ড" বইটি পড়েছিলাম। পড়ার পর আমার কাছে তেমন একটা ভালো লাগেনাই। এই বইটা এত বিখ্যাত কেমনে হইলো সেটাই ভাবছিলাম। পরে অনলাইনে বিভিন্ন মানুষের রিভিউ দেখে আমার ধারণা কিছুটা ক্লিয়ার হয়।
দস্তয়েভস্কি তার "নোটস ফ্রম আন্ডার গ্রাউন্ড" বইটিতে মানব চরিত্রের বিভিন্ন জটিলতা এবং নৈতিকতার দ্বন্দ্বের বিষয়গুলো এক সমাজ বিচ্ছিন্ন যুক্তিবাদী আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যানের মাধ্যমে তুলে ধরেন।
আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যান একজন র্যাশনালিস্ট। এই নিয়ে তার দম্ভের সীমা নাই। তিনি সবকিছু যুক্তি দিয়ে বিবেচনা করেন। তিনি নিজেকে উত্তম মনে করেন। আর অন্যদের গরু ছাগল হিশাবে দেখেন।
তিনি মনে করেন নিজের আইডিওলজি দ্বারা দুনিয়া পরিবর্তন করে ফেলবেন। কিন্তু নিজেও জানেন এটি সম্ভব নয়। তাই মনে অসন্তোষ পুষে রাখেন।
আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যান অতিরিক্ত শেল্ফ কনশাস। তিনি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন বসবাস করেন। একাকিত্ব অনুভব করেন। নিজের সহপাঠী বন্ধুদের ঘেন্না করেন আবার তাদের সাথেই মিশতে যায়। অতিরিক্ত ইগোর কারণে তাদের ছোট করে কথা বলেন। আবার তাদের কাছ থেকেই টাকা ধার চায়। এই পরিস্থিতি তার লাইফের এক মিজারেবল অবস্থার দিকে দৃষ্টিপাত করে।
তিনি নিজের উপর বিরক্ত এবং নিজেকে ঘেন্না করেন। আত্মঘৃনা থেকে নিজের উপর চরম বিরক্তি এবং আত্মবিধ্বংসী হয়ে উঠেন। নিজেকে সব দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত করেন।
অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকেন। নিজের লাইফের উন্নতি করার দিকে কোনো খেয়াল নাই। অ্যাকশন নিতে পারেন না।
সব কিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান কিন্তু বাস্তবতা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। ফলে অসহায়ত্বে ভোগেন। আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন। দুর্দশাগ্রস্ত জীবন যাপন করেন।
দস্তয়েভস্কি দেখান একজন মানুষ র্যাশনালিস্ট হয়েও কতটা আত্মবিধ্বংসী হতে পারেন।
একজন মানুষ যখন বুঝতে পারে তিনি স্বাধীন নয়। ইচ্ছা হলেই যা খুশি করতে পারেন না। তখন সে আত্মবিধ্বংসী হয়ে উঠে। দস্তয়েভস্কি এখানে দেখাতে চেয়েছেন যে মানুষ সবসময় স্বার্থপর নয়, মাঝেমধ্যে স্বার্থবিরোধীও হতে পারে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে নিজের ক্ষতি করে হলেও স্বাধীনতা উপভোগ করার লালসা কি চূড়ান্ত লেভেলের স্বার্থপরতা নয়? আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যান নিজের ক্ষতি করার মাধ্যমেই স্বাধীনতা উপভোগ করেন। তিনি ছিলেন এক নার্সিসিস্ট যে চূড়ান্ত লেভেলের স্বার্থপর।
আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যান নিজে মানুষকে পছন্দ না করলেও তিনি মাঝেমধ্যে মানুষের সাথে মিশতে চান। তার মানুষের সাথে মিশার এই আকাঙ্ক্ষা থেকে প্রকাশ পায় যে একজন মানুষ যতটাই বিদ্বেষপূর্ণ হোক না কেন দিনশেষে তার ঠিকই মানুষের সাহচর্যের প্রয়োজন হয়।
আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যান একজন চরম লেভেলের ব্যর্থ মানুষে পরিণত হন। তিনি মানসিকভাবে নৈতিকতা ধারণ করলেও বাস্তবে সেটা কাজে লাগাতে পারেন না। কারণ চিন্তার জগত এবং বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। শুধু চিন্তা করে কোনো কিছু পরিবর্তন করা যায় না। আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যান নিজের অসহায়ত্বের কথা ভেবে হতাশায় ভোগেন।
আপনিও যদি আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যানের সাথে নিজের মিল খুঁজে পান তাহলে এই অবস্থা থেকে উত্তরণের দরকার আছে।
আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যানের প্রথম সমস্যার শুরু হয় তিনি নিজেকে ধীরে ধীরে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। যার ফলে মানুষের সাথে কীভাবে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হয় সেটি তিনি ভুলে যান। বাস্তবে মানুষের সাথে না মিশলে, মানুষকে বুঝার চেষ্টা না করলে, মানুষের প্রতি ইম্প্যাথি তৈরি হয় না। আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যান মানুষের প্রতি মায়া মমতা অনুভব করেন না। তিনি মানুষকে ভালোবাসতে পারেন না।
অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভাল না। ওভারথিঙ্কিং আমাদের অ্যাকশন নিতে বাধা দেয়। অতিরিক্ত সতর্কতা আমাদের মানসিকভাবে দুর্বল করে ফেলে। কারণ অতিরিক্ত চিন্তার পিছনেই শরীরের সকল শক্তি খরচ হয়ে যায়। যার ফলে লাইফে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি অবশিষ্ট থাকে না।
চিন্তাশীল হওয়ার চেয়ে ডুয়ার হয়ে উঠা জরুরি।
মানুষ নৈতিকভাবে জটিল একটা প্রাণী। চরম আবেগের মুহূর্তে মানুষ নৈতিক দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে পারে। সেই ক্ষেত্রে বলা যায় ভাল এবং খারাপের মধ্যে কোনো বিভাজন নেই। মানুষের এই দুটো চারিত্রিক গুণ একইসাথে অবস্থান করতে পারে। মানুষ শুধুমাত্র যুক্তি দ্বারা চলতে পারে না।
আত্মসমালোচনার দরকার আছে। তবে অতিরিক্ত আত্মসমালোচনা ক্ষতিকর। মানুষ হয়ে জন্মাইছেন যেহেতু দুই একটা ভুল তো করবেন। নিজের ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখুন।
বাস্তবতা বুঝার চেষ্টা করুন। যা আপনার সীমার বাইরে তা কন্ট্রোল করতে পারবেন না। এটি মেনে নিন। ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করুন এবং সেগুলো বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করুন।
নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হোন। যেসব আইডিওলজি আপনাকে শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে সেগুলো সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন করুন।
নিজেকে মানবতার কাজে নিয়োজিত রাখুন। উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়ে ছোট একটা স্টেপ নেওয়া অধিকতর শ্রেয়। এতে জীবনকে নতুনভাবে উপলব্ধি করা যায়। এর মধ্যেও লাইফের মিনিং পাওয়া যায়।
নিজের সীমাবদ্ধতা এবং ভুলগুলোকে মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিন। আত্মগ্রহণযোগ্যতা মানসিক প্রশান্তির জন্য দরকারি।
পর্যাপ্ত ঘুম, শরীরচর্চা এবং মেডিটেশনের মাধ্যমে নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নিন।
লাইফের একটি ভাল মিনিং খুঁজার চেষ্টা করুন। অথবা নিজেই একটি মিনিংফুল লাইফ তৈরি করুন। আত্মবিকাশমূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখুন।
পৃথিবীকে পরিবর্তন করা এটি আপনার দায়িত্ব নয়। তবে আপনি চেষ্টা করে যেতে পারেন। কিন্তু এতে সফলতা বা ব্যর্থতার কিছু নেই।
সবার আগে নিজে ভাল থাকুন এবং আপনার আশেপাশের মানুষদেরকে ভাল থাকতে সহায়তা করুন।
