ইন্টারেস্টিং আধ্যাত্মিক জগত

Spirituality

দুনিয়াতে কত রকমের মানুষ আর কত রকমের বিশ্বাস যে রয়েছে তার কোনো হিসাব নাই। একেক গোষ্টির একেক রকমের ধর্মীয় বিশ্বাস। কেউ মনে করে ঈশ্বর একজন, কেউ মনে করে ঈশ্বর একাধিক, কেউ মনে করে ঈশ্বর সবকিছুতেই বিরাজমান রয়েছে, কেউ ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না আবার কেউ মনে করে সে নিজেই ঈশ্বর। মানুষের আধ্যাত্মিকতার জগতটি বেশ ইন্টারেস্টিং। চলুন, প্রধান কিছু বিশ্বাস বা মতবাদ নিয়ে হালকার উপরে ঝাপসা আলোচনা করা যাক। 

থেইজম বা আস্তিকতা মানে হচ্ছে ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করা। আস্তিকরা এক বা একাধিক ঈশ্বরে বিশ্বাস করে। থেইস্টরা বিশ্বাস করে ঈশ্বর সরাসরি বিশ্বের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত রয়েছে। ঈশ্বর সব কিছু জানেন, দেখেন এবং শোনেন। তাছাড়াও ঈশ্বর বিভিন্ন নিয়ম দিয়ে দেন। আপনি কি খাবেন, কি পোশাক পরবেন, আপনার জীবনের বিভিন্ন ধাপে ঈশ্বর নিজে হস্তক্ষেপ করেন। থেইস্টরা ঈশ্বরের নিয়ম অনুযায়ী জীবন যাপন করেন। থেইজম এর কয়েকটি উদাহরণ হলো মনোথেইজম, পলিথেইজম, প্যান্থেইজম, ইত্যাদি। মনোথেইজম হচ্ছে যেসকল ধর্ম একক ঈশ্বরে বিশ্বাসী, যেমন ইসলাম, খ্রিস্টান, জুডাইজম। পলিথেইজম হচ্ছে যেসকল ধর্ম একাধিক ঈশ্বরে বিশ্বাসী, যেমন হিন্ধু ধর্ম এবং প্রাচীন গ্রীক ধর্ম। প্যান্থেইজম হচ্ছে ঈশ্বর এবং মহাবিশ্বকে এক ও অভিন্নরূপে বিশ্বাস করা। তবে প্যান্থেইস্টরা মনে করেন ঈশ্বর সরাসরি তাদের ব্যাক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করেন না। বরং ঈশ্বর রহস্যময় উপায়ে কাজ করেন।

এনিমিজম অনুযায়ী দুনিয়ার সকল বস্তু, গাছ, প্রাণী, প্রত্যেকের মধ্যেই চেতনা বা আত্মা রয়েছে। প্রত্যেকটি বস্তকনার মধ্যে ঈশ্বরের উপস্থিতি রয়েছে।

ডেইজম মানে হচ্ছে এমন একটি বিশ্বাস যাতে ঈশ্বরের অস্তিত্বকে স্বীকার করা হয়, ডেইস্টরা বিশ্বাস করেন ঈশ্বর মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন তবে বিশ্বের ঘটনায় তিনি কোনো কিছুতে নিজেকে সক্রিয়ভাবে জড়ান না। ডেইজম অনুযায়ী ঈশ্বর মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন এবং প্রাকৃতিক সূত্রগুলো তৈরি করে দিয়েছেন এবং মহাবিশ্ব সেই নিয়ম অনুসারে কাজ করে। ঈশ্বর অলৌকিক কাজ করেন না এবং প্রার্থনার উত্তর দেন না। ডেইস্টরা মূলত লজিক এবং বিজ্ঞানকে গুরুত্ব দেয় তবে এরা ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে না। 

এথেইজম মানে নাস্তিকতা। নাস্তিকরা ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না। তারা মনে করে ঈশ্বরের হস্তক্ষেপ ছাড়াও মহাবিশ্ব নিজে নিজে সৃষ্টি হওয়া সম্ভব। নাস্তিকরা মূলত যুক্তি এবং প্রমাণের উপর ভিত্তি করে কাজ করে।

বুদ্ধইজম বা বুদ্ধধর্ম অনুযায়ী দুনিয়াতে দুঃখ অনিবার্য, আকাঙ্ক্ষা থেকেই আমাদের সকল দুঃখের উৎপত্তি। বুদ্ধ ধর্মের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দুনিয়াবি জীবনের দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ। বুদ্ধরা মানসিক প্রশান্তি লাভের জন্য ধ্যান করেন। বুদ্ধধর্ম সরাসরি ঈশ্বরের ব্যাপারে কিছু বলে না। 

এগ্নোস্টিসিজম অনুযায়ী একজন ব্যক্তির পক্ষে ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া কখনোই সম্ভব না। এগ্নোস্টিসিজম ঈশ্বরের অস্তিত্বকে সরাসরি অস্বীকার করে না আবার গ্রহণও করে না। এগনোস্টিস্টরা মনে করে ঈশ্বরের অস্তিত্ব থাকলেও থাকতে পারে তবে এটি তাদের জানার ক্ষমতার বাইরে। তারা ধর্মীয় বিশ্বাস এবং নাস্তিকতার মাঝামাঝি স্থানে অবস্থান করে। তবে তারা ঈশ্বরের অস্তিত্ব মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে সবসময় মাইন্ড ওপেন রাখে। এরা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিশ্বাসে বিশ্বাস করার চেয়ে নিজে ঈশ্বরের অস্তিত্ব অনুসন্ধান করার পক্ষে।

এক্সিস্টেনশিয়ালিজম বা অস্তিত্ববাদ হলো এমন একটি দার্শনিক মতবাদ যা বলে "মানুষের জীবনের পরম কোনো অর্থ নেই"। আমাদের নিজেদের জীবনের অর্থ নিজেদেরকেই তৈরি করে নিতে হবে। মানুষের জীবনে এমন কোনো ইউনিভার্সাল ফিক্সড উদ্দেশ্য নেই যা সবাইকে মেনে চলতেই হবে। অস্তিত্ববাদ সমাজের চাপিয়ে দেয়া নিয়ম নীতি অনুসরণ করার পরিবর্তে ব্যক্তিগত চিন্তা, মূল্যবোধ এবং স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেয়।

সেক্যুলারিজম মানে ধর্মনিরপেক্ষতা। সেক্যুলারিজম অনুযায়ী, ধর্ম ধর্মের জায়গায় এবং রাষ্ট্র রাষ্ট্রের জায়গায় থাকবে, একে অন্যের কাজে বাধা দিতে পারবে না। একজন ব্যাক্তি চাইলে ধর্মহীন বা ধর্মীয় জীবন যাপন করতে পারবে, এতে ধর্ম বা রাষ্ট্র বলপ্রয়োগ করতে পারবে না। সেক্যুলারিজম মূলত ব্যক্তি স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেয়। আমেরিকা, নরওয়ে, কানাডা, ইত্যাদি সেক্যুলার রাষ্ট্রের উদাহরণ।

মিস্টিসিজম হচ্ছে প্রকৃত বাস্তবতার সাথে আত্মার উপলব্ধি। মিস্টিকরা বিভিন্ন ধ্যান, প্রার্থনা, রিচুয়ালের মাধ্যমে নির্বাণ প্রাপ্তির চেষ্টা করে। তারা ঈশ্বর বা সর্বশক্তির নৈকট্যে পৌঁছাতে চায়। মিস্টিসিজম সাধারণত ধর্ম কেন্দ্রিক। যেমন সুফিরা মিস্টিক। তাদের উদ্দেশ্য হলো দুনিয়ার যাবতীয় নিয়ম নীতির উর্ধ্বে গিয়ে চেতনার একটি উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানো।

ন্যাচারালিজম বা প্রকৃতিবাদ হচ্ছে এমন একটি বিশ্বাস, যেখানে মনে করা হয় সবকিছু সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়মেই চলে, কোনো সুপারন্যাচারাল বা অতিপ্রাকৃতিক শক্তির দ্বারা নয়। ন্যাচারালিস্টরা গভীর পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে প্রকৃতিকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করে। ডারউইন একজন প্রকৃতি বিজ্ঞানী ছিলেন।

আধুনিক স্পিরিচুয়ালিটি হলো বিভিন্ন ধ্যান, মেডিটেশন, ম্যানিফেস্টেশন, ইয়োগা, মাইন্ডফুলনেস ইত্যাদির মাধ্যমে আত্ম উন্নয়ন প্রক্রিয়া। একজন ব্যক্তি তার ধর্মীয় বা আদর্শ থেকে বিচ্যুত না হয়েও এগুলো চর্চা করতে পারেন।

এগুলো ছাড়াও দুনিয়াতে হাজারো ধর্ম এবং বিশ্বাস বা মতবাদ রয়েছে। প্রত্যেকটি ধর্ম বা বিশ্বাস সেই ধর্মে বিশ্বাসীর জন্য গুরুত্বপূর্ন। প্রত্যেকের আধ্যাত্মিক রাস্তাটি আলাদা হলেও মূলত উদ্দেশ্য একই তা হলো নিজেকে জানা এবং নিজের সুবিধামত একটি অর্থপূর্ন জিবন যাপন করা।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url