এ.পি.জে. আব্দুল কালামের কথায় জীবনের নতুন দিশা

Discussion with APJ Abdul Kalam

আমাদের বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পটেনশিয়ালিটি আছে, তারা কাজ করতে চায়, কিন্তু নিজের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে কিছু করার মত পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক সাপোর্ট এবং সুযোগ পায় না। এটা বাংলাদেশের জন্য একটা বড় ক্রাইসিস।

এই বিষয়ে গতকাল রাতে আমি ইন্ডিয়ার এক বিখ্যাত লোকের সাথে আলাপ করি। তিনি সারা বিশ্বে পরিচিত। এপিজে আব্দুল কালাম। একজন রকেট সাইন্টিস্ট। উনি বেশ কিছু ভাল বই পত্র লিখেছেন।

আমি সরাসরি উনার বাড়িতে গিয়া উপস্থিত হই। আমরা কুশল বিনিময় করি। একসাথে কফি পান করি। বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ আলোচনা করি। তার মধ্যে তিনি আমাকে কিছু উপদেশ দেন। আমি জ্ঞানীদের কাছ থেকে উপদেশ গ্রহণ করতে পছন্দ করি। এইখানে তিনার দেয়া কিছু উপদেশ তুলে ধরছি।

তিনি বলেন — 

স্বপ্ন তা নয় যা তুমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখ, স্বপ্ন হলো যা তোমাকে ঘুমাতে দেয় না। বেশি বেশি স্বপ্ন দেখ, কারণ স্বপ্ন পরিণত হয় ভাবনায়, ভাবনা থেকে কর্ম, এবং কর্ম থেকেই আসে ফলাফল। 

তোমার স্বপ্ন একদিন বাস্তবে পরিণত হবে, তোমাকে জাস্ট ডিসিপ্লিন মেন্টেইন করে ধারাবাহিকভাবে নিয়মিত কাজ করতে হবে।

কখনো হাল ছেড়ে দিও না। জীবনের সমস্যাগুলো যেন কখনো তোমাকে পরাজিত করতে না পারে। মানুষ পরাজিত হওয়ার জন্য পৃথিবীতে আসেনি।

যত বেশি লার্নিং হবে তত ক্রিয়েটিভিটি বৃদ্ধি পাবে। ক্রিয়েটিভিটি চিন্তাকে লিড দেয়। চিন্তা থেকে জ্ঞানের উৎপত্তি হয়। আর জ্ঞান তোমাকে মহৎ লোকে পরিণত করে। সবসময় নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করবে। শেখার কোনো শেষ নাই। নেভার স্টপ লার্নিং।

সফলতার জন্য কষ্ট করতে হবে। কারণ কষ্ট ছাড়া সফলতা অসম্ভব। একটা পুরানো কথা আছে - যে একদিনের জন্য রাজা হতে চায় সে একবছর পরে ফকির হয়। সুতরাং সত্যিকারের সফলতার জন্য তোমাকে সময় দিতে হবে। একদিনের জন্য রাজা হয়ে লাভ নাই। তোমাকে দীর্ঘস্থায়ী চিন্তা করতে হবে। 

সফলতার একটা ম্যাপ আছে। যেকোনো কিছু শুরু করার আগে প্রথমে তোমাকে পরিকল্পনা করতে হবে। পরিকল্পনা হলো ক্যাপিটাল। তারপর উদ্যোগ নিতে হবে। উদ্যোগ হলো উপায়। অবশেষে তোমার পরিকল্পনা অনুযায়ী কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। কারণ কঠোর পরিশ্রমই হলো সফলতার মূল চাবিকাঠি।

একজন ব্যক্তিকে পরাজিত করা সহজ তবে তাকে জয় করা অনেক কঠিন। কাউকে পরাজিত করে তোমার কোনো লাভ নাই। এতে দুইজনেরই লস। কাউকে পরাজিত করার চেয়ে বরং তাকে জয় করার চেষ্টা কর। প্রতিপক্ষকে সম্মান কর। তুমি কাউকে সম্মান দিলে সম্মান পাবে।

মাঝেমধ্যে সমস্যার ভিতরে ঢুকে না গিয়ে সমস্যা থেকে পালিয়ে যাওয়া ভাল অথবা সমস্যাটিকে উপর থেকে দেখা। হঠাত বৃষ্টি হলে যেমন আমরা কোথাও ছাদের নিচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করি ব্যাপারটা অনেকটা সেইরকম। 

মানুষের জীবনে কঠিন সময়ের প্রয়োজন আছে কারণ কঠিন সময় আমাদের শক্তিশালী মানুষে পরিণত করে। জীবন কঠিন বলেই আমরা সফলতা ইঞ্জয় করতে পারি। 

তুমি সূর্যের মত উজ্জ্বলতা ছড়াতে চাইলে প্রথমে তোমাকে সূর্যের মত জ্বলতে হবে। আগুনে ঝাপ দিতে পারার মানসিকতা না থাকলে বড় ধরনের পরিবর্তন সম্ভব না। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তাই জীবনে সফল হতে চাইলে ঝুঁকি নেয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। কর্মঠ হও। দায়িত্ব নাও। তোমার যেখানে বিশ্বাস আছে সেটি নিয়ে কাজ কর। যদি না কর তার মানে তুমি তোমার ভাগ্যকে অন্যের হাতে তুলে দিয়েছ। 

তোমার মিশনে সাকসেস হতে চাইলে তোমাকে এককভাবে লেগে থাকতে হবে। একা হও। ব্যতিক্রম হও। নিজের আলাদা সত্ত্বাকে মবের সাথে মিলিয়ে ফেলবে না। তুমি শুধু তুমিই হতে পারবে। কারণ যে যার মত অলরেডি হয়ে গেছে। 

জীবনে সফল হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম করা থামাবে না। এটাই তোমাকে ব্যতিক্রম হিসাবে গড়ে তোলে। জীবনে একটি লক্ষ্য নির্ধারণ কর। সবসময় জ্ঞান অন্বেষণ কর। কঠোর পরিশ্রম কর এবং মনে বিশ্বাস রাখ তোমার জীবন সুন্দর হবে।

আত্মনির্ভরশীল হও। স্বাধীন হও। কারণ তুমি আত্মনির্ভরশীল হতে না পারলে কেউ তোমাকে সম্মান করবে না। এমনকি তোমার কাছের লোকজনও তোমার উপর বিরক্ত হবে। প্রথমত অর্থনৈতিকভাবে আত্মনির্ভরশীল হওয়া খুবই জরুরী।

জীবনে একটি মহৎ লক্ষ্য সেট কর, জ্ঞান অন্বেষণ কর, কঠোর পরিশ্রম কর, এবং ধর্য্য ধারণ কর। এই চারটি বিষয় যদি কেউ তার জীবনে অনুসরণ করে তাহলে তাকে সফল হওয়া থেকে কেউ আটকাতে পারবে না। 

তোমাকে আলাদাভাবে চিন্তা করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। আলাদাভাবে চিন্তা করার জন্য সাহস দরকার, সেটা থাকতে হবে। তবে ব্যতিক্রম হওয়ার সমস্যা হচ্ছে তুমি সফল হওয়া পর্যন্ত অবিশ্বাসীদের সাথে তোমাকে ফাইট করে যেতে হবে। কারণ সফল না হওয়া পর্যন্ত তারা চিন্তাও করতে পারে না যে তোমার দ্বারা কোনো কিছু অর্জন করা সম্ভব।

প্রথম বিজয়ের পর রেস্ট নিও না কারণ তুমি যদি দ্বিতীয় বিজয়ে ফেইল মারো তাহলে অনেকেই বলবে তোমার প্রথম বিজয়টি জাস্ট ভাগ্য ছিল। প্রথম বিজয়ের পর নিজের আদিম প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে রেখে সামঞ্জস্যতা বজায় রাখার চেষ্টা করবে, কারণ বিজয়ের পরেই আসে সবচেয়ে কঠিন সময়। এই সময় খুব বেশি সচেতন থাকা জরুরী।

আমরা আজকের দিনটি স্যাক্রিফাইস করি কারণ যাতে আগামীকাল আমাদের সন্তানেরা ভাল থাকতে পারে। অন্যদের জন্য বেঁচে থাকাটাই জীবনকে অর্থপূর্ন করে তোলে।

গ্রেট লোকেরা ধর্মকে বন্ধু বানানোর হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে, আর ছোটলোকেরা এটা নিয়ে ফাইট করে। তোমার যখন যেটা কাজে লাগবে তখন সেটা ব্যবহার করবে। তোমার উদ্দেশ্য হলো নিজের জীবনকে সুন্দর করা এবং অন্যের জীবনকে সুন্দর রাখতে সাহায্য করা। জীবনে সুখে থাকাটাই সফলতা।

—-—-—

শেষে চলে আসার সময় কালাম সাহেব আমাকে তার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিটি দেখান। সেখানে বেশ প্রাচীন এবং দামি দামি কিছু বই ছিল। তিনি আমাকে তার লেখা "ইগ্নাইটেড মাইন্ডস" বইটি গিফট করেন। বইটি আমি আজকে পড়া শুরু করলাম। সময় করে একটা রিভিউ দিয়ে দিব।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url