মাস্টারি

দাবা খেলায় একজন গ্র্যান্ড মাস্টার দাবাড়ু তার প্রতিটি চাল অবচেতনে ক্যালকুলেশন করে ফেলেন এবং হঠাৎ এক চালেই প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে ফেলেন। একজন শুটারের ক্ষেত্রে টার্গেটকে নিখুঁতভাবে শুট করার দক্ষতাটি তার মাসল মেমোরিতে পরিণত হয়। অন্যদের কাছে মনে হতে পারে এগুলো কোনো অলৌকিক ক্ষমতা বা অসাধারণ প্রতিভা। কিন্তু এটিই হলো মাস্টারি। আমাদের প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো বিষয়ে প্রতিভা রয়েছে। যে কেউ চাইলে মাস্টারি অর্জন করতে পারে। মাস্টারি হলো এমন একটি দক্ষতা যা একজন ব্যক্তি দীর্ঘ সময়ের অধ্যবসায় এবং প্র্যাকটিসের মাধ্যমে অর্জন করে। একজন মাস্টার তার কাজের জায়গায় সেরা। তিনি তার ফিল্ডে যে কোনো সমস্যা খুব দ্রুত বুঝতে পারেন এবং চমৎকার সমাধান দিতে পারেন। যা অন্যদের কাছে কঠিন কাজ মনে হয় তা একজন মাস্টারের কাছে শুধুমাত্র খেলা। মাস্টারি অর্জনের সাথে সাথে একজন ব্যক্তির ইন্টুইশন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং এই ক্ষমতা দ্বারা তিনি অনেক কিছু ইনস্ট্যান্ট বুঝতে পারেন। 

এই লেখায় মাস্টারি অর্জন করার কৌশলগুলো নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করবো।

প্রত্যেক মানুষের একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রতিভা রয়েছে যা অন্যদের চেয়ে আলাদা। এটি আমাদের শৈশবকালেই প্রকাশ পায়। তবে ধীরে ধীরে সমাজ এবং পরিবেশের চাপে তা আমরা হারিয়ে ফেলি। মাস্টারি অর্জন করার ক্ষেত্রে, প্রথমে আপনার যেখানে প্রতিভা আছে সেটি খুঁজে বের করতে হবে। যখন আপনার প্রতিভার জায়গাটি খুঁজে পাবেন তখন সে জায়গায় সময় এবং শ্রম দিয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। প্রথমে আপনার প্রতিভার জায়গাটি খুঁজে পেতে অসুবিধা হতে পারে। প্রতিভার জায়গাটি খুঁজে পেতে আপনি আপনার বাবা-মা অথবা পরিবারের বড়দের জিজ্ঞেস করতে পারেন ছোটবেলায় আপনার বিশেষ কোনো দক্ষতা ছিল নাকি যা সবাই পছন্দ করতো। এছাড়াও আপনি আপনার ইন্টারেস্টের জায়গাগুলোতে মনোযোগ দিয়ে ভাবতে পারেন। নিজেকে প্রশ্ন করতে পারেন আপনি সত্যিকার অর্থেই লাইফে কী হতে চান। ভাবুন এমন কী কাজ আছে যেটাতে আপনি সেরা হতে পারেন যা সমাজের জন্যেও উপকারী। যখন আপনি আপনার প্রতিভার জায়গাটি খুঁজে পাবেন, সেখানে আপনি কাজ করে বুঝতে পারবেন যে আপনি স্যাটিস্ফাইড ফিল করছেন এবং আপনার কাছে জীবনকে অর্থপূর্ণ মনে হবে।

যদি ভালোভাবে খেয়াল করেন তাহলে দেখবেন লাইফে প্রতিটি ঘটনাই আপনাকে একটি দিকনির্দেশনা দিচ্ছে।

একজন মাস্টারের জন্য পুরা বিশ্বটাই পাঠশালা, তিনি সব কিছু থেকেই শেখার চেষ্টা করেন। তিনি জীবনের বড় একটা সময় শুধু শেখার পিছনেই ব্যয় করেন। তিনি কারো মনোযোগ আকর্ষণের জন্য শেখেন না, তিনি শেখেন নিজের আগ্রহ থেকে।  

একটা হাইপোথিসিস আছে, কোনো কিছুতে এক্সপার্ট হতে হলে মিনিমাম দশ হাজার ঘণ্টা সময় ব্যয় করা প্রয়োজন। এটা আসলেই সত্য। কোনো কিছুতে মাস্টার হতে চাইলে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নিয়মিত অনুশীলনের কোনো বিকল্প নেই।

মাস্টারি অর্জন করার ক্ষেত্রে, বাস্তবতা থেকে শিখুন, বাস্তবতাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করুন। আপনার ফিল্ডের বেসিক নলেজ সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখুন। ধৈর্যের সাথে শিখুন এবং প্রতিনিয়ত নিজেকে বিকশিত করুন।

যদি সম্ভব হয় তাহলে আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী একজন ভাল মেন্টর খুঁজে নিন। যে আপনাকে সঠিক গাইডলাইন দিবে। মেন্টরের অভিজ্ঞতা থেকে শিখুন। তবে শেখা হয়ে গেলে মেন্টরের ছায়া থেকে বের হয়ে আসুন। যতটুকু শিখেছেন তা বাস্তবে প্রয়োগ করার চেষ্টা করুন। একজন সঠিক মেন্টর খুঁজে নেওয়া সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সঠিক মেন্টর খুঁজে পাওয়া সম্ভব না হলে নির্ভরযোগ্য সোর্স থেকে শিখুন।

আপনি যখন মাস্টারি অর্জন করে ফেলবেন তখন বিভিন্ন সামাজিক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে পারেন। তাই আপনাকে সামাজিক দক্ষতাও অর্জন করতে হবে। মানুষের সাইকোলজি বুঝতে হবে। আপনি যত বড় মাস্টারই হন না কেন মানুষের সাথে মিশতে না পারলে, তাদের মনোবৃত্তি বুঝতে না পারলে কোনো লাভ নাই। কারণ আপনি মাস্টারি অ্যাপ্লাই করার ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে খারাপ মানুষদের দ্বারা বাধাগ্রস্ত হতে পারেন। আপনি মাস্টার হয়ে লাভ নাই যদি আপনার দক্ষতা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অ্যাপ্লাই করতে না পারেন। তাই আপনাকে মানুষের আবেগ অনুভূতি বুঝতে হবে। প্রতিটি মানুষের ডার্ক সাইড আছে। মানুষের এই ডার্ক সাইড সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। কর্মক্ষেত্রে মানুষের এই ডার্ক সাইডের সাথে ডিল করার দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

মাস্টারি অর্জন করার পর আসে ক্রিয়েটিভ অ্যাক্টিভ ফেইজ। এই ফেইজে আপনি বেসিক নলেজ অ্যাপ্লাই করার পাশাপাশি ক্রিয়েটিভ কাজ করবেন। আপনি নতুন কিছু উদ্ভাবন করবেন যা সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম এবং অরিজিনাল। আপনি প্রতিনিয়ত নিজেই নিজের সীমাকে ছাড়িয়ে যেতে থাকবেন। প্রতিবার আপনি বিশ্বের সামনে এমন কিছু একটা নিয়ে হাজির হবেন যা সম্পূর্ণ নতুন এবং তা অন্যরা দেখার জন্য মরিয়া হয়ে থাকবে। তাদের কাছে মনে হবে আপনার বিশেষ ট্যালেন্ট রয়েছে।

প্রতিটি মাস্টার তাদের জীবনে অসংখ্যবার বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন।সমালোচনার শিকার হয়েছিলেন। বারবার পিছিয়ে পড়েছিলেন। হতাশ হয়েছিলেন। আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ভেঙ্গে পড়েছিলেন। তবে বিকাশের ক্ষেত্রে এগুলো দরকার হয়। মাস্টারি কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে অর্জন করতে হয়। একজন মানুষকে সব দিকে থেকে কোণঠাসা করে রাখা যায় না। যার প্রতিভা আছে, সে লাইফে যতোই বাধা বিপত্তির সম্মুখীন হোক না কেন, কোনো না কোনো উপায়ে সে তার প্রতিভা প্রকাশ করবেই। তাই কঠিন পরিস্থিতিতে ভেঙ্গে পড়বেন না বরং জীবনের সমস্যাগুলোকে আত্মবিকাশের অংশ হিসাবে দেখুন এবং নিজের ক্ষমতার পূর্ণ বিকাশ করুন। আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলুন। নিজেকে কখনো ছোট মনে করবেন না।

আপনার শত্রুদের ওয়েলকাম জানান। কারণ তারাই আপনাকে কঠোর এবং আরো শক্তিশালী হতে সহায়তা করে।

অভিজ্ঞতা অর্জনের সাথে সাথে আমাদের ব্রেইনের গাঠনিক পরিবর্তন হয়। আমরা যতবার নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করি ততবার আমাদের ব্রেইনে ফিজিক্যালি পরিবর্তন হয়। অভিজ্ঞতা অর্জনের সাথে সাথে আমাদের ইন্টুইশন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। একটি ফিল্ডে আমাদের যত বেশি অভিজ্ঞতা হয় সেটি আমরা ততো ভালোভাবে বুঝতে পারি। আপনি একটি ফিল্ডে যত বেশি অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন সেই ফিল্ডে আপনি ততো দ্রুত অনায়াসে যেকোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। প্রকৃত অর্থে মাস্টারি তখনই সম্ভব যখন আপনি যৌক্তিক বিশ্লেষণের পাশাপাশি নিজের ইন্টুইশন ক্ষমতার সংমিশ্রণ ঘটাতে পারবেন।

মাস্টারি অর্জন করার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা ধরে রাখা জরুরি একটি বিষয়। সবসময় একই বিষয়ে সময় দিলে বিরক্তি চলে আসতে পারে। তাই আপনার মূল লক্ষ্যের পাশাপাশি আপনি অন্যান্য বিষয়ে এক্সপ্লোর করে দেখতে পারেন। যা আপনাকে আনন্দ দেয় তাই শিখুন তবে আপনার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হবেন না। একজন মাস্টার তার সকল অভিজ্ঞতাকে জড় করে তা নির্দিষ্ট একটি ফিল্ডে কাজে লাগায়। আপনি যাই শিখুন না কেন তা নির্দিষ্ট একটি ফিল্ডে কাজে লাগানোর চেষ্টা করুন। কোনো অভিজ্ঞতাই বৃথা যায় না। উদাহরণস্বরূপ, আপনার কাছে মনে হতে পারে আপনি অনেক আগে চায়না ভাষা শিখেছিলেন কিন্তু তা এখন আপনার কোনো কাজে লাগছে না। কিন্তু আপনার ঐ শেখার প্রসেসিংটা এবং ব্রেইনের যে বিকাশ হয়েছে তা ঠিকই নতুন আরেকটি ভাষা বা নতুন কোনো কিছু শেখার ক্ষেত্রে কাজে লাগবে। পূর্বের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন। কখনো থেমে যাবেন না। সবসময় অনুপ্রেরণা ধরে রাখুন।

মাস্টারি একটি দীর্ঘ সময়ের যাত্রা, যার জন্য ডেডিকেশন, উৎসাহ, উদ্দীপনা এবং ধৈর্যের প্রয়োজন রয়েছে। 

মাস্টারি অর্জন করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হলো নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক শিক্ষক বেছে নিতে হবে, সবসময় শেখার মানসিকতা বজায় রাখতে হবে, কখনো হাল ছেড়ে দেয়া যাবে না, নিজেকে একটি নিয়মের মধ্যে নিয়ে এসে ধৈর্যের সাথে অনুশীলন করতে হবে, কমিউনিটির সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, নিজের আগ্রহের বিষয়টি পেশা হিসাবে নিতে হবে।

আপনি যত বেশি মাস্টারি অর্জন করার দিকে এগিয়ে যাবেন, বাস্তবতার সাথে ততো বেশি কানেক্টেড ফিল করবেন এবং জীবনকে আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url