জীবন যখন দিশেহারা: সেনেকার দুই হাজার বছরের পুরনো চিঠিতে প্রশান্তির খোঁজ

Seneca's Letter

আমরা সবাই একটা দৌড়ের মধ্যে আছি। সুখের দৌড়, সাফল্যের দৌড়, কিংবা কেবল টিকে থাকার দৌড়। মাঝে মাঝে আমরা ক্লান্ত হয়ে যাই, থমকে দাঁড়াই। মনে প্রশ্ন জাগে, আমি আসলে কী করছি? জীবনটা কোন দিকে যাচ্ছে?

আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছর আগে, রোমান স্টয়িক দার্শনিক সেনেকা তার বন্ধু লুসিলিয়াসকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠিতে তিনি এমন কিছু অমোঘ সত্য তুলে ধরেছিলেন, যা আজকের এই মডার্ন, ব্যস্ত এবং বিভ্রান্তিকর জীবনেও আমাদের জন্য লাইটহাউজের মতো কাজ করতে পারে।

আসুন জানি, সেই প্রাচীন চিঠিতে লুকিয়ে থাকা জীবন বদলানো ৪টি শিক্ষা।

১. দর্শন কোনো বিলাসিতা নয়, এটি জীবনের লাইফ জ্যাকেট

অনেকেই মনে করেন ফিলোসফি হলো অলস দুপুরে বুদ্ধিজীবীদের সময় কাটানোর বিষয়। সেনেকা বলছেন একেবারেই না।

দর্শন হলো জীবনের কম্পাস। ঝড়ের কবলে পড়া নাবিক যেমন কম্পাস ছাড়া দিক হারায়, দর্শন বা প্রজ্ঞা ছাড়া মানুষও জীবনের অনিশ্চয়তায় দিশেহারা হয়ে পড়ে। প্রতিদিন আমাদের সামনে হাজারো সমস্যা আসে, হাজারো সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কোনটা সঠিক, কোনটা ভুল, তা বলে দেয় দর্শন। এটি আমাদের ভয়হীন এবং প্রশান্ত মনে বাঁচতে শেখায়।

দর্শন বা আত্ম-উন্নয়নমূলক বই পড়া কেবল শখের বিষয় নয়, এটি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য।

২. আবেগকে অভ্যাসে পরিণত করুন

আমরা নতুন বছরে বা জন্মদিনে অনেক বড় বড় সংকল্প করি। কাল থেকে পড়াশোনা করব, কাল থেকে নিয়মিত ক্লাসে যাবো। কিন্তু কয়েক দিন পরেই সেই জোশ বা উদ্দীপনা হারিয়ে যায়।

সেনেকা তার বন্ধুকে বলছেন, মহৎ সংকল্প করার চেয়ে, যা সংকল্প করেছ তা ধরে রাখা বেশি জরুরি। শুরুর উদ্দীপনাটা কেবল একটা ভালো লাগা বা আবেগ। এটাকে প্রতিদিনের চর্চার মাধ্যমে দৃঢ় সংকল্পে রূপ দিতে হবে। যতক্ষণ না ভালো কাজটা আপনার স্বভাব বা অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে, ততক্ষণ থামা যাবে না।

একদিনের হিরো না হয়ে, প্রতিদিনের যোদ্ধা হোন। ধারাবাহিকতাই সাফল্যের চাবিকাঠি।

৩. ভাগ্যকে ভয় পাবেন না

জীবন কি আগে থেকেই নির্দিষ্ট? নাকি সব ঈশ্বরের ইচ্ছা? নাকি সবই আকস্মিক ঘটনা? আমরা জানি না কাল আমাদের সাথে কী হবে।

সেনেকা খুব সুন্দর একটি সমাধান দিয়েছেন। তিনি বলছেন, মহাবিশ্ব যে নিয়মেই চলুক না কেন, আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। আমরা বাইরের ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না, কিন্তু সেই ঘটনায় আমাদের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। দর্শন আমাদের শেখায় ঈশ্বর বা প্রকৃতির নিয়মকে হাসিমুখে মেনে নিতে, আর দুর্ভাগ্যকে সাহসের সাথে মোকাবিলা করতে।

যা আপনার নিয়ন্ত্রণে নেই, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করা বন্ধ করুন। নিজের মনকে এমনভাবে তৈরি করুন যেন যেকোনো পরিস্থিতিতে আপনি অটুট থাকতে পারেন।

৪. ধনী হওয়ার আসল সূত্র 

আমরা ভাবি আরও টাকা, আরও বড় বাড়ি, আরও দামী গাড়ি হলে আমরা সুখী হব। কিন্তু সেনেকা আমাদের একটি রূঢ় বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছেন। তিনি এপিকিউরাসের একটি উক্তি উদ্ধৃত করেছেন:

তুমি যদি প্রকৃতির প্রয়োজন অনুযায়ী বাঁচো, তবে তুমি কখনোই গরিব হবে না। আর যদি মানুষের ধারণার বা লোভের বশবর্তী হয়ে বাঁচো, তবে তুমি কখনোই ধনী হতে পারবে না।

প্রকৃতির চাহিদা সীমিত, ক্ষুধা পেলে খাবার, তৃষ্ণা পেলে জল। এর একটা শেষ আছে। কিন্তু লোভ বা বিলাসিতার কোনো শেষ নেই। আপনি যদি ভুল রাস্তায় হাঁটেন, সেই রাস্তার কোনো শেষ গন্তব্য নেই। পৃথিবীর সব সম্পদ পেলেও আপনার মনে হবে আরও চাই।

আপনি কত টাকার মালিক, তা দিয়ে আপনার ধনী হওয়া মাপা যায় না। আপনার চাহিদা কত কম, সেটাই আপনার আসল সম্পদ। যার চাহিদা কম, সেই সত্যিকারের স্বাধীন।

শেষ কথা

সেনেকার এই চিঠি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সুখ বাইরের কোনো দোকান থেকে কেনা যায় না। এটি তৈরি করতে হয় নিজের ভেতরে। অস্থিরতা আর অনিশ্চয়তার এই যুগে, আসুন আমরা বাইরের চাকচিক্যের পেছনে না ছুটে নিজের মনকে শান দিতে শুরু করি।

কারণ, দিনশেষে শান্তি কোনো গন্তব্য নয়, শান্তি হলো পথ চলার পদ্ধতি। 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url