প্রাণীজগতে প্রজনন প্রক্রিয়া
প্রকৃতিতে অপ্রাকৃতিক বলে কিছু নেই। যা ঘটে তাই প্রাকৃতিক। কিন্তু প্রকৃতিতে এমন অদ্ভুত কিছু ঘটনা ঘটে যা ফ্যান্টাসি বলে মনে হয়। উদাহরণ হিসাবে প্রাণীজগতের সেক্স লাইফের কথা বলা যেতে পারে। যেমন হাতি তার শুঁড় দিয়ে মাস্টারবেশন করে, ফ্রুটফ্লাই তার নিজের চেয়ে বিশ গুণ বড় সাইজের স্পার্মোটোজা তৈরি করে।
মানুষের জীবনে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে সঙ্গী নির্বাচন করার প্রক্রিয়া। মানুষ তার শক্তি সামর্থ্য, রূপ, সম্পদ, ইত্যাদি দেখিয়ে বিপরীত লিঙ্গের ব্যক্তিকে আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। একইভাবে প্রাণীজগতের বিভিন্ন প্রাণীয়ও বিভিন্ন উপায়ে বিপরীত লিঙ্গের প্রাণীকে আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। এইখানে সবার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে যৌন প্রজনন। সন্তান উৎপাদনের মাধ্যমে নিজের জিন ট্রান্সফার করা। যদিও মানুষের ক্ষেত্রে বিষয়টা কিছুটা ভিন্ন। কারণ মানুষ জাস্ট মজার জন্যেও সেক্স করে। কিন্তু উভয়ের ক্ষেত্রে জেনেটিক উদ্দেশ্য একই।
প্রাণীদের জীবনযাত্রা ও প্রজনন ব্যবস্থা বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে বিভিন্ন রকম হতে পারে। কোন প্রাণী সারাজীবন একই পার্টনারের সঙ্গে থাকে, আবার কেউ একাধিকবার পার্টনার বদলায়। প্রাণীজগতে বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যে বিভিন্ন ধরন দেখা যায়। যেমনঃ বিষমকামী, সমকামী, উভকামী, মনোগামি, পলিগামি, বহুব্রীহি, ইত্যাদি।
মনোগামী
যখন একটি পুরুষ এবং একটি নারী সারাজীবনের জন্য একসাথে জোড়া বাঁধে, অথবা কোনো নির্দিষ্ট সময়ে একটি মাত্র সঙ্গী থাকে, তখন তাদের মনোগামি বলা হয়। এটি তুলনামূলক পাখিদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যেও মনোগামী রয়েছে। যেমনঃ পেঙ্গুইন, রাজহাঁস, নেকড়ে, বাল্ড ঈগল, তুষার প্যাঁচা, কালো শকুন, ক্যালিফোর্নিয়ার ইঁদুর, অ্যালবাট্রসেস, ইত্যাদি। মনোগামি হওয়ার সুবিধা হচ্ছে বাচ্চা পালনের দায়িত্ব পার্টনারের সাথে ভাগ করে নেওয়া যায়। বাচ্চার জন্য খাবার সংগ্রহ করতে সুবিধা হয়। সন্তানের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বৃদ্ধি পায়।
পলিগামি
যখন একটি পুরুষ একাধিক নারীর সাথে প্রজনন প্রক্রিয়ায় অংশ নেয় তখন তাকে পলিগামি বলা হয়। পলিগামি মূলত পুরুষদের জন্য প্রজনন ক্ষমতা বৃদ্ধি করার একটি কৌশল। এটি তুলনামূলক স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। যেমনঃ বাঘ, সিংহ, হায়েনা, বেবুন, ইত্যাদি। পলিগামি হওয়ার কারণ মূলত জিনগত বৈচিত্র্য। একাধিকবার পার্টনার বদলানোর ফলে জিনগত বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায় যা প্রজাতির বেঁচে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
হারেম
এইটা আরেক ধরনের পলিগামি। যেখানে এক পুরুষের সাথে নারীর একটা দল থাকে। যেমনঃ গরিলা, শিম্পাঞ্জি, লাল হরিণ, তিতির, বার্ক বিটল, হগফিশ, ইত্যাদি। হারেমে মূলত পুরুষের ক্ষমতা বেশি থাকে এবং পুরুষ নারীদের নিয়ন্ত্রণ করে। হারেমে নারীদের মনোভাব প্রতিযোগিতাপূর্ন এবং সবাই মিলে সন্তানের দায়িত্ব পালন করে।
বহুব্রীহি
এটি হলো যেখানে এক নারীর সাথে একাধিক পুরুষের একটি দল জোড়া বাঁধে। যেমনঃ রাণী মৌমাছি, অ্যান্টেচিনাস, ঘরোয়া ইঁদুর, স্পটেড স্যান্ডপাইপার, অ্যাকর্ণ কাঠঠোকরা, স্যান্ডবার হাঙর, ইত্যাদি। এটি মূলত নারীর জন্য একটি কৌশল যেখানে উন্নত সন্তান জন্ম দেয়ার অপশন বেশি থাকে।
প্রমিস্কিউটি
এখানে কোনো জোড়া থাকে না। যে যার মত পছন্দের সঙ্গী নির্বাচন করে প্রজনন প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। যেমনঃ হামিংবার্ড, বনবোস, ফ্রুটফ্লাইস, ইত্যাদি। কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে যখন পরিবেশ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে তখন নারী এবং পুরুষ উভয়ের জন্যেই এটি সুবিধাজনক।
সমকামিতা
সেসব প্রাণী সমলিঙ্গের সদস্যদের মধ্যে যেকোনো ধরনের যৌন কার্যকলাপে লিপ্ত হয় তাদের সমকামী বলে। ১৫০০ এর অধিক প্রজাতির উপর গবেষণা করে দেখা গেছে ৫১ টি প্রাণীর মধ্যে সমকামিতার উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে। যেমনঃ পেঙ্গুইন, ডলফিন, ভেড়া, জিরাফ, ইত্যাদি। নারী এবং পুরুষ উভয় প্রাণীর মধ্যেই সমকামিতার উপস্থিতি রয়েছে। জঙ্গলে বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যে এটি সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখতে এবং দ্বন্দ্ব প্রশমনে অভিযোজনমূলক ভূমিকা রাখে। কিছু প্রাণীর জিনগত ত্রুটি অথবা হরমোনের তারতম্যের কারণেও সমকামী হতে পারে। অনেক সময় এটি সামাজিক পরিবেশ এবং পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে।
স্পার্ম প্রতিযোগিতা
কিছু প্রজাতির পুরুষেরা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে কে কার চেয়ে বেশি নারীর সাথে সেক্স করতে পারে। যে যত কম সময়ে যত বেশি নারীর সঙ্গে সেক্স করতে পারে সে তত সফল। যেমনঃ জলপাখি, ডনক, গোবরের পোকা, ইত্যাদি। এখানে শুধু সেক্স করাটাই মুখ্য বিষয় নয়, নিজের স্পার্ম দ্বারা ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করাটাই হচ্ছে সফলতা।
প্রজননের ক্ষেত্রে নারীর সঙ্গী নির্বাচন
প্রজনন প্রক্রিয়ায় সঙ্গী বাছাইয়ের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঙ্গী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের চেয়ে বেশি যাচাই করে। এর একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হল নারীরা গর্ভ ধারণ করে। গর্ভাবস্থায় নারীর দেখাশোনার জন্য একজন সঙ্গীর প্রয়োজন হয়। সঙ্গী ভাল না হলে তার দুর্বল অবস্থায় পুরুষটি তাকে ছেড়ে চলে যেতে পারে। তাই সঙ্গী নির্বাচন করার ক্ষেত্রে নারীরা অত্যন্ত সচেতন থাকে। নারীরা বিশেষ করে শক্তিশালী পুরুষদের জীবন সঙ্গী হিসাবে পেতে চায়। নারীরা এমন পুরুষদের জীবন সঙ্গী হিসাবে নির্বাচন করে যারা তাদের এবং সন্তানদের ভবিষ্যতে টিকে থাকতে সাপোর্ট দিতে পারবে।
প্রজননের ক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গী নির্বাচন
প্রজনন প্রক্রিয়ায় পুরুষের ক্ষেত্রে সঙ্গী বাছাইয়ের বিষয়টি কিছুটা বিতর্কিত। পুরোনো তত্ত্ব অনুযায়ী পুরুষদের মধ্যে সঙ্গী নির্বাচনের প্রক্রিয়া ব্যতিক্রম। যাইহোক, প্রজনন প্রক্রিয়ায় পুরুষের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এবং পুরুষদেরকেও অনেক মূল্য দিতে হয়। পুরুষ যখন সন্তানের যত্ন নেয়ার প্রতি আগ্রহী হয় তখন সঙ্গী নির্বাচনের বিষয়টি গুরুত্ব দেয়। অথবা কোনো গোষ্ঠীর মধ্যে যে নারীটি সবচেয়ে বেশি গুণসম্পন্ন তার প্রতি পুরুষরা সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট হয়।
উপসংহার
প্রাণীজগতে পরবর্তী প্রজন্মের মাধ্যমে নিজের জিন টিকিয়ে রাখাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। যার জন্য বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যে বিভিন্ন রকমের যৌন আচরণ দেখা যায়। সকল যৌনতার মূল উদ্দেশ হচ্ছে পরবর্তী প্রজন্মের মাধ্যমে নিজের জিন টিকিয়ে রাখা। তাই প্রাণীজগতে প্রজনন প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়াকে সফলতা এবং না পারলে সেটাকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়।
