মেডিটেশন: পৃথিবীর সব ঐশ্বর্যের চেয়েও মূল্যবান গুপ্তধনের খোঁজে
একজন লোক একটি পাথরের উপর বসে ভিক্ষা করছিলেন। হঠাৎ এক পথিক সে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ভিক্ষুক হাত বাড়িয়ে বলল, “আমাকে একটু সাহায্য করুন।”
পথিক বললেন, “বাবা, আমার কাছে দেওয়ার মতো কিছুই নেই।”
একটু থেমে আবার বললেন, “তবে একটা কথা বলি—তোমার কাছেই এমন এক গুপ্তধন আছে, যা পৃথিবীর সব ঐশ্বর্যের চেয়েও মূল্যবান।”
ভিক্ষুক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এমন কিছু তো আমি কখনও দেখিনি। কোথায় আছে সেই গুপ্তধন?”
পথিক হেসে বললেন, “তুমি কি কখনও ভেবে দেখেছো, যেই পাথরের উপর বসে তুমি প্রতিদিন ভিক্ষা করো, তার ভেতরে কী আছে?”
জিজ্ঞাসু হয়ে ভিক্ষুক পাথরটিকে আছাড় দিয়ে ভেঙে ফেললেন।
আর বিস্ময়ের সাথে দেখতে পেলেন—পাথরের ভিতর লুকিয়ে ছিল এক অমূল্য রত্ন!
আজ তোমাকে দেওয়ার মত আমার কিছু নেই। তবে সেই পথিকের মতো তোমার ভিতরে লুকিয়ে থাকা এক অজানা গুপ্তধনের সন্ধান দিতে পারি। খুঁজে দেখো, হয়তো তোমার মাঝেই আছে এক অপার সম্ভাবনার রত্ন, যা কেবল জাগিয়ে তোলার অপেক্ষায়।
Truth is not something outside to be discovered, it is something inside to be realized.
— Osho
বর্তমানে দুনিয়া খুব দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, এই দ্রুত গতির সাথে তাল মিলিয়ে চলা অনেকের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, ফলে অতিরিক্ত মানসিক চাপ, উদ্বিগ্নতা, হতাশা আজকাল একটি সাধারণ অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে এবং এতে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়া খুবই স্বাভাবিক। এই বিশৃঙ্খলার মাঝেও নিজেকে স্থির ও শান্ত রাখার একটি কার্যকর এবং শক্তিশালী উপায় হলো নিয়মিত মেডিটেশন চর্চা করা।
মেডিটেশন একটি মানসিক ব্যায়াম, যার মাধ্যমে মনোযোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় চিন্তা দূর করা যায়। এটি মূলত নিজের মনের গভীরে প্রবেশ করে নিজেকে ভালোভাবে বোঝা, পরিষ্কারভাবে চিন্তা করা, আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং বর্তমানে উপস্থিত থাকার সক্ষমতা অর্জনের এক উপায়। অনেকে মনে করেন, মেডিটেশন মানেই মাথা খালি করে ফেলা। কিন্তু আসলে এটি হচ্ছে অপ্রয়োজনীয়, দুষিত চিন্তাগুলোকে ছেড়ে দিয়ে গভীর মনোযোগের মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে নিজেকে ও চারপাশকে পর্যবেক্ষণ করার প্রক্রিয়া।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে হাজার হাজার বছর যাবত মেডিটেশন চর্চা হয়ে আসছে। ভারতে হিন্দু দর্শনে, নেপালে বৌদ্ধ ধর্মে, চীনের তাও দর্শনে এবং জাপানের জেন প্রথায় মেডিটেশন ছিল একটি আধ্যাত্মিক অনুশীলন। যদিও এটি প্রাথমিকভাবে ধর্মীয় আচারবিধি হিসেবে ব্যবহৃত হতো, বর্তমানে এটি বিশ্বের সর্বত্র একটি বৈজ্ঞানিক ও থেরাপিউটিক পদ্ধতি হিসেবে গৃহীত।
মেডিটেশনের বিভিন্ন পদ্ধতি
মেডিটেশন চর্চার বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। একেকরকম মেডিটেশন পদ্ধতির একেকরকম উদ্দেশ্য রয়েছে। নিন্মে কয়েকটি পদ্ধতি সম্পর্কে সংক্ষেপে জেনে নেই।
মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন: এটির উৎপত্তি বৌদ্ধ ধর্ম থেকে। এটি বর্তমানে উপস্থিত থাকা, চিন্তাকে পর্যবেক্ষন করা, এবং আবেগকে প্রতিক্রিয়াহীনভাবে নিয়ন্ত্রণ করার প্রতি গুরুত্ব দেয়। এটি উদ্বিগ্নতা কমায় এবং ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স বাড়ায়।
অ্যাটেনশন ফোকাস মেডিটেশন: এই পদ্ধতিতে শুধু একটি জিনিসের উপর মনোযোগ দেওয়া হয়, যেমন মনোযোগ দিয়ে মোমবাতির আগুন দেখা, মন্ত্র পড়া অথবা নিজের শ্বাস প্রশ্বাস খেয়াল করা। এতে কোনো কিছুতে মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।
এম্প্যাথেটিক মেডিটেশন: এই পদ্ধতিতে নিজের এবং অন্যের প্রতি ভালবাসা ও সদিচ্ছার অনুভূতি তৈরি করার চেষ্টা করা হয়। এতে সহমর্মিতা বৃদ্ধি পায় এবং নেতিবাচক আবেগ হ্রাস পায়।
বডি স্ক্যান মেডিটেশন: এই পদ্ধতিতে নিজের সমস্ত শরীরের প্রতি মনোযোগ দেওয়া হয়, প্রথমে পা থেকে শুরু করে শেষে মাথা পর্যন্ত শরীরের প্রত্যাকটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গের প্রতি মনোযোগ দেওয়া হয়। এতে মন ও শরীরের মধ্যে কানেকশন তৈরি হয় এবং বর্তমানে উপস্থিত থাকার একটি রাস্থা খুঁজে পাওয়া যায়।
এছাড়াও আরো বিভিন্ন রকমে মেডিটেশন পদ্ধতি রয়েছে, যেমন মন্ত্র মেডিটেশন, ইয়োগা, তাই চি, ডাইনামিক মেডিটেশন, হাঁটা, ইত্যাদি।
মেডিটেশনের বৈজ্ঞানিক উপকারিতা
আধুনিক বিজ্ঞান বলে যে মেডিটেশন আমাদের শরীর ও মনের উপর বেশ ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। নিয়মিত মেডিটেশন চর্চার ফলে শরীর ভালো থাকে। মেডিটেশনের ফলে নেতিবাচক হরমন কর্টিসল নিঃসরণ হ্রাস পায়। ফলে মানসিক পীড়ন ও উদ্বিগ্নতা কমে। মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। আবেগ নিয়ন্ত্রণের থাকে। মানসিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। বিষণ্ণতার লক্ষণ হ্রাস পায়। ইতিবাচক মনোভাব বজায় থাকে। ব্লাড প্রেশার স্বাভাবিক থাকে। হার্ট ভালো থাকে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ঘুম ভালো হয়। ইনসোম্নিয়া থাকেলে তা হ্রাস পায়। তীব্র শারীরিক ব্যথা কমে।
মেডিটেশন করার নিয়ম
মেডিটেশন চর্চা শুরু করতে কোনো আলাদা যন্ত্র বা আলাদাভাবে পোশাক পড়ার প্রয়োজন নেই। অথবা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারী হতে হবে না। এটা যে কেউ হালকা কিছু নিয়ম অনুসরণ করে চর্চা করতে পারে:
- প্রথমে এমন একটি শান্ত জায়গা বেছে নাও যেখানে কেউ তোমাকে ডিস্টার্ব করবে না।
- একটি চেয়ারে বা ফ্লোরে আরাম করে বস। মেরুদণ্ড সোজা রাখো তবে কোথাও হেলান দিবে না।
- প্রথম প্রথম ৫ থেকে ১০ মিনিটের সময় সেট করো। পরবর্তিতে এটি ২০ থেকে ৩০ মিনিটে বৃদ্ধি করো।
- তোমার শ্বাস প্রশ্বাসের দিকে মনোযোগ দাও। স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নাও এবং ছেড়ে দাও। তোমার নাক দিয়ে বাতাস ডুকছে, পেট ফুলে যাচ্ছে, আবার নাক দিয়ে বাতাস বের হয়ে যাচ্ছে, এই প্রক্রিয়াগুলোতে মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করো।
- মেডিটেশনের সময় যখন তোমার চিন্তাগুলো তোমার মনোযোগ সরিয়ে নিবে তখন মানসিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখো। এই বিষয়টি মেনে নাও এবং পুনরায় শ্বাস প্রশ্বাসের দিকে মনোযোগ ফিরিয়ে নিয়ে আসো। জাস্ট এটাই হলো মেডিটেশন, বারবার মনোযোগ হারানো আবার তা ফিরিয়ে নিয়ে আসা, এর বেশি কিছু নয়।
নিয়মিত মেডিটেশন চর্চা করো। ধারাবাহিকতা বজায় রেখে প্রতিদিন ৫ মিনিট মেডিটেশন করলেও তা যথেষ্ট। একটি রুটিন তৈরি করো। প্রতিদিন একই সময়ে মেডিটেশন করলে তা অভ্যাসে পরিণত হবে। বিভিন্ন অ্যাপ অথবা ইউটিউবে গাইডেড মেডিটেশন পাওয়া যায়, সেগুলো দেখে গাইডেড মেডিটেশন করতে পারো। মাঝেমধ্যে ৫ মিনিট মেডিটেশন করাও অনেক কঠিন মনে হতে পারে। আবার মাঝেমধ্যে বেশ ভালো লাগবে। সুতরাং বিষয়টা সহজভাবে গ্রহণ করার চেষ্টা করো। ভালো না লাগলে নিজের প্রতি কঠোর হওয়ার প্রয়োজন নেই।
মেডিটেশন কোনো যাদু নয় যে তোমার সকল সমস্যা নিমিষেই দূর করে দিবে। তবে নিয়মিত মেডিটেশন চর্চার ফলে তুমি এর সুফল অনুভব করতে পারবে। এটা একটা লাইফ স্কিল। যা চর্চার মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। নিয়মিত মেডিটেশন প্র্যাকটিস করার ফলে তুমি নিজেকে ভালোভাবে বুঝতে পারবে। তোমার মাইন্ড পরিষ্কার এবং শান্ত থাকবে। জীবনকে নতুনভাবে উপলব্ধি করতে পারবে। এটি তোমার জীবনকে আরো সহজ ও সুন্দর করতে অনুপ্রেরণা জোগাবে। তাই নিয়মিত মেডিটেশন চর্চা করো। আজ থেকেই শুরু করো। একটা গভীর শ্বাস নাও।
