সাইকোপ্যাথ চেনার উপায়
আমাদের মধ্যে "সাইকো" শব্দটি বেশ প্রচলিত। সাধারণত মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন কাউকে ইন্ডিকেট করতে আমরা এই শব্দটি ব্যবহার করি। অথবা মজা করেও কোনো বন্ধুকে সাইকো বলে ডাকি। কিন্তু আমরা যতটা সহজে এই শব্দটি ব্যবহার করি আসলে এটি তত সহজ কোনো বিষয় নয়। একজন সাধারণ মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির সাথে একজন সাইকোর বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। তাছাড়া কাউকে সাইকো বলা ঠিক নয়। সাইকোপ্যাথি হলো একটি মানসিক রোগ। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে বলা হয় সাইকোপ্যাথ। সাইকোপ্যাথ থেকে সাইকো শব্দটির প্রচলন শুরু হয়। একজন সাইকোপ্যাথ ভয়ংকর লেভেলের খারাপ হতে পারে। আবার কারো কারো মধ্যে কম বা মাঝারি লেভেলের সাইকোপ্যাথিক বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে।
সাইকোপ্যাথের বৈশিষ্ট্য
সাধারণত সাইকোপ্যাথ বলতে যাদের ব্যক্তিত্বে এম্প্যাথির অভাব, অপরাধপ্রবণতা, ম্যানিপুলেশন, এবং ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলিং করার প্রবণতা রয়েছে তাদেরকে বুঝানো হয়। এদের মধ্যে অন্যের প্রতি দয়া মায়া কাজ করে না, অনুশোচনা কম, এবং এরা প্রচণ্ড আত্মকেন্দ্রিক হয়। সাইকোপ্যাথরা মানুষকে ক্ষতির উদ্দেশ্যে ম্যানিপুলেট করে। এরা প্যাথলজিক্যাল মিথ্যাবাদী। সাইকোপ্যাথদের মধ্যে মাত্রাগত পার্থক্য রয়েছে। কেউ অতিরিক্ত অপরাধ প্রবণ, আবার কেউ কিছুটা কম অপরাধ প্রবণ। অনেকের মধ্যেই কিছু কিছু সাইকোপ্যাথিক বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। তবে সবাই অপরাধ প্রবণ নয়। ভয়ংকর সাইকোপ্যাথদের ফাঁদে পড়লে জীবন তছনছ হয়ে যেতে পারে। এরা সিরিয়াল কিলার টাইপের। তাই জীবনে চলার পথে এদের কাছ থেকে সাবধানতা বজায় রাখা জরুরি।
সাইকোপ্যাথদের আবেগীয় বৈশিষ্ট্য
সাইকোপ্যাথের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এদের ইম্প্যাথি কম। এরা চরম স্বার্থপর। কেউ তাদের স্বার্থে আঘাত দিলে এরা ভয়ংকর হয়ে উঠে। এরা কাউকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসতে পারে না। মানুষের কষ্ট বুঝতে পারে না। তবে ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে ঠিকই মানুষের আবেগ নিয়ে খেলতে পারে। এরা মানুষকে কষ্ট দিয়ে মজা পায়।
সাইকোপ্যাথরা সাধারণত আকর্ষণীয় এবং স্মার্ট হয়। এরা তাদের পার্সোনালিটি দ্বারা মানুষকে খুব সহজে ইমপ্রেস করে ফেলতে পারে। মানুষের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে তার কাছাকাছি যাওয়া যায়। আর সাইকোপ্যাথরা মানুষের কাছাকাছি গিয়ে তার ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য বুঝার চেষ্টা করে। যাতে তাকে ফাঁদে ফেলা যায়।
এরা নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য মানুষকে ইউজ করে। স্বার্থ উদ্ধার হয়ে গেলে মানুষের সাথে বাজে ব্যবহার করে। প্রথমে এদেরকে ভালো মানুষ মনে হলেও পরে বুঝা যায় এরা কতটা ভয়ংকর হতে পারে। একবার এদের ফাঁদে পড়ে গেলে এই ফাঁদ থেকে বের হওয়া কঠিন।
এরা নিজেকে অনেক বড় মনে করে। নিজের সম্পর্কে বেশ উচ্চ ধারণা পোষণ করে। এরা সাধারণত বেশ অহংকারী হয়, আর নিজের ব্যাপারে গর্ব করে সবসময়।
এদের আবেগ কম। বেশিরভাগ সময় মিথ্যা আবেগ প্রকাশ করে। কোনো আবেগীয় মুহূর্তে অতিরঞ্জিত প্রতিক্রিয়া দেখায়। দেখে মনে হবে সে অনেক কষ্ট পেয়েছে কিন্তু আসলে তা সত্য নয়। তবে এরা অন্যের আবেগ নিয়ে চিন্তা করতে পারে। অন্যের আবেগ নিয়ে খেলতে পারে।
সাইকোপ্যাথদের আচরণগত বৈশিষ্ট্য
মিথ্যা কথা বলা এদের অভ্যাস। এরা এমনভাবে মিথ্যা কথা বলে তা বেশিরভাগ মানুষ বিশ্বাস করে ফেলে। এরা মানুষকে মিথ্যা আশা দেখিয়ে ধোঁকা দেয়। বেশিরভাগ পলিটিশিয়ানদের মধ্যে এমন বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
এরা ইম্পালসিভ ধরনের হয়। কিছু বিশেষ মুহূর্তে নিজের আবেগ কন্ট্রোল করতে পারে না। তখন এরা খুব ভয়ংকর হয়ে উঠে। ভবিষ্যৎ পরিণতি না ভেবেই একটা কিছু করে ফেলে। যেমন তীব্র আগের সময় এদের হাতে পিস্তল থাকলে ট্রিগার চাপ দেওয়ার তাড়নাবোধ করবে।
এরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দায়িত্বে অবহেলা করে। মানুষের সাথে কমিটমেন্ট ভঙ্গ করে এবং তাতে কিছু মনে করে না। এদের মনে নৈতিকতার স্থান নেই বললেই চলে।
এদের গিল্টি ফিলিংস নাই। মানে এরা কাউকে কষ্ট দিয়ে কোনো অপরাধ করে অনুশোচনাবোধ করে না। বরং মানুষকে কষ্ট দিয়ে মজা পায়। এরা যুদ্ধের সমাধান করার চেয়ে যুদ্ধ সচল রাখতে চায়। মানুষকে কষ্ট পেতে দেখলে এরা আনন্দ অনুভব করে।
এরা খুবই আক্রমণাত্মক হয়। এরা সুযোগ পেলেই কাউকে মৌখিক বা শারীরিকভাবে আক্রমণ করতে পারে। এরা এমন ধরনের শিকার খুঁজে বেড়ায় যাকে আক্রমণ করতে সুবিধা হয়। সহজ সরল বোকা মানুষেরা এদের প্রধান শিকার।
সাইকোপ্যাথদের সামাজিক বৈশিষ্ট্য
এরা খুব তাড়াতাড়ি বিরক্তিবোধ করে। তাই সবসময় কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চায়। এরা নিজেরা ভায়োলেন্স পছন্দ করে এবং অন্যদেরকেও ভায়োলেন্স করতে উৎসাহিত করতে পারে। সাইকোপ্যাথদের সাথে থাকতে থাকতে অনেক স্বাভাবিক মানুষেরাও সাইকোপ্যাথদের মত বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে। এরা অন্যকে সহজেই ইনফ্লুয়েন্স করতে পারে। যদিও স্বাভাবিক মানুষেরা পরে বুঝতে পারে যে তাদের ম্যানুপুলেট করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে তারা অনুশোচনাবোধ করে। কিন্তু সাইকোপ্যাথদের অনুশোচনা হয় না। বরং তারা উত্তেজিতবোধ করে।
সাধারণত এরা ক্রিমিনাল মাইন্ড। সুযোগ পেলেই অপরাধ করে। এরা আইনের তোয়াক্কা করে না তেমন একটা। আইনকে ফাঁকি দেওয়ার বিভিন্ন কলাকৌশল সম্পর্কে ভালো ধারণা আছে এদের। এদের বেশিরভাগেরই জীবনে অল্প বয়সে জেলে যাওয়ার রেকর্ড রয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, এইখানে দুই একটা বৈশিষ্ট্য কারো সাথে মিলে যেতে পারে তার মানে সে সাইকোপ্যাথ না। তার হয়ত এখান থেকে উত্তরণের উপায় আছে। কিন্তু সাইকোপ্যাথদের সাথে এখানের বেশিরভাগ বৈশিষ্ট্যের মিল পাওয়া যাবে। তারা চাইলেও ভালো হতে পারে না। তবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। সব সাইকোপ্যাথ আবার সরাসরি ভায়োলেন্স করে না। কারণ এইটা কঠিন। তারা আশেপাশের মানুষদের বিভিন্নভাবে কষ্ট দেওয়ার চেষ্টা করে। কর্মক্ষেত্রে কলিগদের বা কর্মচারীদের মানসিকভাবে নিপীড়ন করার তালে থাকে। এদের সাথে একজন সাধারণ মানুষের জন্য বসবাস করা কঠিন। এদের সাথে কেউ দীর্ঘসময় রিলেশনে থাকলে বা একই স্থানে কাজ করলে তার মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
এক গবেষণা থেকে জানা যায়, বিভিন্ন বড় বড় কোম্পানির লিডারশিপ পজিশনে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৬০% ব্যক্তির মধ্যে সাইকোপ্যাথের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এটি একটি সাইকোলজিক্যাল ফ্যাক্ট। তাই বড় পজিশনে থাকা কারো সাথে কথা বলতে সাবধানতা বজায় রাখা জরুরি। তাদের কথাবার্তা খেয়াল করে শুনবেন। কারণ এরা প্রচুর ম্যানিপুলেটিভ হয়। এরা মানুষকে খুব দ্রুত প্রভাবিত করতে পারে।
