বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন

Student movement against discrimination

মূলত ঘটনার শুরু ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ১৪ তারিখে। যদিও তার ১০-১৫ দিন আগে থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিল।

২০১৮ সালে শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের জন্য আন্দোলন করে। তারপর সরকার কোটা বাতিল করে দেয়। কিন্তু ২০২৪ সালে হাইকোর্ট রায় দেয় কোটা পুনর্বহাল থাকবে। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়য়ের শিক্ষার্থীরা পুনরায় কোটা সংস্কারের জন্য আন্দোলনে নামে রাস্তায়।

Quota movement in Bangladesh

দেশের নির্বাহী বিভাগের কাছে শিক্ষার্থীদের এক দফা দাবি - "সরকারি চাকরির সকল গ্রেডে সকল ধরনের বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করে শুধুমাত্র পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনায় রেখে কোটাকে ন্যূনতম পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে।" 

এই আন্দোলনটিকে শুরু থেকেই সরকার অবমূল্যায়ন করে আসছিল। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন - "আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিহত করতে ছাত্রলীগই যথেষ্ট"। এই কথা শুনে ছাত্রসমাজ ক্ষুব্ধ হয়। কোটা আন্দোলন আরো বড় আকার ধারণ করে।

এছাড়াও কিছুদিন আগে সাংবাদিক ইমরান একটি প্রতিবেদন করেন, যেখানে তিনি দেখান যে কীভাবে বিসিএস এবং বিভিন্ন সরকারি চাকরির প্রশ্নগুলো ফাঁস হয়ে যায়। এতে চাকরি না পাওয়া ক্ষুব্ধ ছাত্রসমাজ কোটা আন্দোলনে যোগ দিয়ে এই আন্দোলনটিকে আরো বড় আকারে রূপ দান করে।

১৪ জুলাই, শিক্ষার্থীরা বিশাল মিছিল নিয়ে শাহাবাগে আন্দোলন করে। রাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি প্রেস কনফারেন্সে বক্তব্য দেয়। সেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে কথা বলেন এবং এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের "রাজাকার" বলে গালি দেন। এতে সারাদেশের শিক্ষার্থীরা খেপে ওঠে। রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থীরা হল থেকে বেরিয়ে এসে টিএসসিতে রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড় হন। সবাই স্লোগান দিতে থাকে - "তুমি কে? আমি কে? রাজাকার। রাজাকার।"

Chhatra League atrocities

১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দামের নেতৃত্বে টোকাইবাহিনি (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের অন্যান্য ছাত্রলীগ) আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর নির্মমভাবে হামলা করে। আহতদের হসপিটালে ভর্তি করানো হয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেক নারী শিক্ষার্থীও ছিল। হামলার ছবিগুলো ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যায়। মূলত হাসিনার পতনের সূত্রপাত ঘটে এখান থেকেই।

Abu Sayeed

১৬ জুলাই, সারাদেশের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে। বিশ্ববিদ্যালয়সহ, স্কুল এবং কলেজের শিক্ষার্থীরাও যোগ দেয় আন্দোলনে। রংপুরে পুলিশের গুলিতে আবু সাইদ নামের একজন শিক্ষার্থী নিহত হয় এবং ছাত্রলীগের হামলায় বিভিন্ন জায়গায় আরও ৫ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়। আবু সাইদের গুলি খাওয়ার দৃশ্যটি ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যায়। সেখানে দেখা যায় আবু সাইদ পুলিশের সামনে দুই হাত পেতে দাঁড়িয়ে আছে। পুলিশ সরাসরি আবু সাইদের বুকে গুলি চালায়। আবু সাইদের মৃত্যু আন্দোলনে ফুয়েল দেয়। এই ঘটনার পরের দিন ঢাকার রাজপথ উত্তাল হয়ে ওঠে।

সন্ধ্যার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগকে হল ছাড়তে বাধ্য করে। সারারাত ধরে হল থেকে ছাত্রলীগ নিধনের প্রক্রিয়া চলতে থাকে।

পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে তাই সরকার ভয় পেয়ে যায় এবং সারাদেশে অনির্দিষ্ট কালের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে দেওয়া হয়। কারণ এই আন্দোলনটি ছিল মূলত সাধারণ শিক্ষার্থীদেরই। এই আন্দোলনে শুরু থেকে কোনো রাজনৈতিক দলের সরাসরি সাপোর্ট ছিল না।

১৭ তারিখ সকালে ছাত্রলীগ মুক্ত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি হল। কিন্তু সকল শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেয় প্রশাসন। ছাত্ররা হল ছাড়তে বাধ্য হয়। হলপাড়া খালি হয়ে যায়। ছাত্রলীগ মুক্ত হলে একদিনও থাকতে পারলো না সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

সন্ধ্যার দিকে শেখ হাসিনা কালো শাড়ি পরে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেয় স্ক্রিপ্ট দেখে দেখে। সাধারণ মানুষ বুঝে ফেলেন শেখ হাসিনা প্রকৃত অর্থে শোকাহত নন। তারা এটিকে অভিনয় হিসেবে বিবেচনা করেন। ফেসবুকে হাসিনাকে ব্যাপক হারে ট্রল করা হয়।

১৮ জুলাই, সারা দেশের মানুষ "কমপ্লিট শাটডাউন" পালন করে। ফেসবুকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পেইজ এবং গ্রুপ থেকে এই কর্মসূচিগুলো সমন্বয়কেরা ঘোষণা দিতেন। 

Student movement Bashundhara gate (Private University)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন হলছাড়া তখন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের হাল ধরে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা ঢাকাসহ সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলন করে। কোটার আন্দোলন থেকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ডাইমেনশন চেঞ্জ হতে থাকে। তারা স্লোগান দেয় -  "স্বৈরাচার, স্বৈরাচার, নিপাত যাক, নিপাত যাক", "এক দুই তিন চার। শেখ হাসিনা গদি ছাড়", ইত্যাদি স্লোগানে মুখরিত হয় রাজপথ। এই দিন বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ সাধারণ ছাত্রদের উপর হামলা করে। পুলিশের গুলিতে প্রায় ৫০ জনের মত শিক্ষার্থী নিহত হয় এবং হাজারের উপরে আহত হয়। 

আন্দোলনটি মূলত ফেসবুকের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল, ইন্টারনেট এখানে বড় ভূমিকা রেখেছিল। তাই সরকার সারাদেশে মোবাইল নেটওয়ার্ক ডাউন করে দেয়। ফলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সঠিক সময়ে অন্যান্য জায়গার খবর পাচ্ছিলো না এবং তারা অনলাইনে খবর পৌঁছাতে পারছিল না। কিন্তু সরকার ইন্টারনেট বন্ধ রেখেও আন্দোলন প্রতিরোধ করতে পারেনি। শিক্ষার্থীসহ লাখ লাখ সাধারণ মানুষ আন্দোলনে যোগ দিতে রাস্তায় নেমে আসে। 

শিক্ষার্থীরা আগুন দিয়ে বাংলাদেশ ন্যাশনাল টেলিভিশন ভবন পুড়িয়ে দেয় এবং সারাদেশের সাথে বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। এতে দেশবাসী খুব মজা পায়। কারণ বিটিভি ছিল আওয়ামী লীগের প্রথম সারির দালাল মিডিয়া। এছাড়াও বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং  বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায় শিক্ষার্থীরা। ওবায়দুল কাদেরের অফিস সেতু ভবনে আগুন দেয় শিক্ষার্থীরা। 

Metrorail in fire

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করার পরিকল্পনা করেন। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাচ্ছে এমন খবর ভাইরাল হয় ফেসবুকে। সন্ধ্যার দিকে শিক্ষার্থীরা এয়ারপোর্ট এর ভিআইপি গেট আটকানোর জন্য সেদিকে রওনা হয়। সেদিন সত্যিই যদি শেখ হাসিনাকে রাস্তায় পাওয়া যেত তাহলে বড় ধরনের একটা ম্যাসাকার ঘটে যেত। তারপর হঠাৎ করে সারাদেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায়। ১৩ কোটি গ্রাহক ইন্টারনেট সেবা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। দেশের অভ্যন্তরে কেউ কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারছিলো না এবং দেশের বাইরেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। রাতে সারাদেশে বিজিবি মোতায়েন করে সরকার। 

১৯ জুলাই, রাত থেকে ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। সারাদেশে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি পালন করা হয়। ইন্টারনেট না থাকার কারণে প্রাইভেট অফিসগুলোতে কাজ করা সম্ভব হচ্ছিল না। ফ্রিল্যান্সারদের মাথায় হাত। আইটি সেক্টরগুলোর পুরো বন্ধ হয়ে যায়। বেশিরভাগ অফিসই বন্ধ ছিল। কারণ বর্তমানে বেশিরভাগ অফিসই ইন্টারনেট নির্ভর। সমন্বায়করা ৯ দফা ঘোষণা করেন। রাতে কারফিউ দেয়া হয়। সেনাবাহিনী নেমে যায় মাঠে। সেনাবাহিনীকে পুরো দেশের মানুষের বিরুদ্ধে দাড় করিয়ে দেয় সরকার।

Bangladesh Army against their own people

২০ জুলাই, ইন্টারনেট বন্ধ, কারফিউ চলছে। তখন টিভিই একমাত্র ভরসা দেশের খবর জানার জন্য। মেইনস্ট্রিম মিডিয়াগুলো আন্দোলনের তেমন একটা খবর দেখাচ্ছিল না। তবে আলজাজিরা ইংলিশ এবং বিবিসিতে কিছু কিছু নিউজ দেখাচ্ছিল। এছাড়াও ডেইলি স্টার এবং প্রথম আলো আন্দোলনের নিউজ ছাপিয়েছে। যদিও ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে আন্দোলন কিছুটা শিথিল হয়ে পড়ে। কারণ এই আন্দোলনটা ছিল মূলত ফেসবুক কেন্দ্রিক। ইন্টারনেট না থাকার কারণে অনেকে প্রিপেইড মিটারে বিদ্যুৎ বিল এবং গ্যাস বিল দিতে পারছিল না। ফলে অনেকেই বিদ্যুৎহীন ছিল এবং গ্যাস না থাকায় রান্না করতে পারছিল না। শিশু এবং বৃদ্ধদের কষ্ট হয়েছে। এই দিন আইনমন্ত্রী, তথ্যমন্ত্রী, এবং শিক্ষামন্ত্রীর সাথে তিন সমন্বায়ক মিটিং করেন। তারপর তারা ৮ দফা দাবি ঘোষণা করেন। 

২১ জুলাই, বিচার বিভাগ পূর্বের কোটা বাতিল করে মেধার ভিত্তিতে ৯৩% কোটায় রাখার পক্ষে মেধা ভিত্তিতে রায় দেয়। তবে সরকারের নির্বাহী বিভাগ চাইলে নির্ধারিত কোটা বাতিল, সংশোধন বা সংস্কার করতে পারবে। 

২২ জুলাই, প্রধানমন্ত্রী কোটাপ্রথা সংস্কার করে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তৈরি করা প্রজ্ঞাপন অনুমোদন দেয়। কমপ্লিট শাটডাউন ৪৮ ঘণ্টার জন্য স্থগিতের ঘোষণা দেন সমন্বায়ক নাহিদ ইসলাম। সাধারণ ছুটির মেয়াদ ও কারফিউ বৃদ্ধি করা হয়। 

২৩ জুলাই, সরকারি চাকরির নিয়োগে সব গ্রেডে ৯৩% মেধা ও ৭% কোটায় বিধান রেখে প্রজ্ঞাপন জারি এবং একই সাথে গেজেট প্রকাশ করা হয়। 

২৪ জুলাই, নির্বাহী আদেশে তিনদিন সাধারণ ছুটির পর অফিস চালু হয়। কারফিউ শিথিলের সময় বৃদ্ধি করা হয়। 

২৬ জুলাই, তিন সমন্বায়ক নাহিদ, আসিফ, এবং বকরকে ডিভি তুলে নিয়ে যায়। 

২৭ জুলাই, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ধরতে এলাকায় এলাকায় "ব্লক রেইড" পরিচালনা শুরু হয়। দুই সমন্বায়ক হাসনাত এবং সার্জিকেও ডিবি তুলে নিয়ে যায়। 

Nahid, Asif, Hasnat, Sarjis, Nusrat

২৮ জুলাই, নারী সমন্বায়ক নুসরাতকে ডিভি তুলে নিয়ে যায়। টিভিতে দেখা যায় ডিবি অফিসে সমন্বায়করা একটা কাগজে পড়ে পড়ে কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। ঢাকাতে ২০০টিরও বেশি মামলায় দুই লাখ ১৩ হাজারের বেশি মানুষকে অভিযুক্ত করা হয়। ইন্টারনেট খুলে দেয়। তবে ফেসবুকসহ সকল সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ ছিল। ইন্টারনেট স্পিড ছিল খুবই কম। সব এলাকায় ইন্টারনেট পাওয়া যাচ্ছিল না। শুধু ভিআইপি এলাকাগুলোতে ইন্টারনেট স্পিড ভালো ছিল। তবে ভিপিএন ইউজ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় লগইন করতে হয়েছে। ইন্টারনেট যত দিন বন্ধ ছিল আমেরিকায় বাংলাদেশি প্রবাসীরা রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছিল।

Police vs Students

২৯ জুলাই, ১৪ দলের সাথে বৈঠক করে আওয়ামী লীগ। জামাত শিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশের গুলি চালানোর বিভিন্ন ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ভিডিওগুলোতে দেখা যায় পুলিশ নির্বিচারে গুলি করছে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের। একটা ছেলে পালিয়ে এক বিল্ডিং এর ছাদের কর্নারে লুকিয়ে ছিল। পুলিশ ছেলেটাকে খুঁজে বের করে ৬ রাউন্ড গুলি করেছিল।

৩০ জুলাই, আন্দোলনে নিহত শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারিভাবে শোক দিবস পালন করা হয়। যা শিক্ষার্থীরা প্রত্যাহার করে। নিহতদের রক্তের প্রতীক হিসেবে ফেসবুকে প্রোফাইল পিকচার লাল করতে বলা হয়। আওয়ামী লীগ ব্যতীত সবাই দুই একদিনের মধ্যেই ফেসবুক প্রোফাইল পিকচার লাল করে ফেলেন। "মার্চ ফর জাস্টিস" কর্মসূচি ঘোষণা দেওয়া হয়। 

A silent funeral in memory of martyred students

৩১ জুলাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কফিন বানিয়ে শহিদদের স্মরণে গায়েবি জানাজা পড়ানো হয়। "রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ" কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

০১ আগস্ট, এই দিন ঢাকায় প্রচুর বৃষ্টি হয়। বন্ধী ৬ সমন্বয়ককে ছেড়ে দেয় ডিবি। জামাত নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন জারি করে আওয়ামী লীগ। নিহতদের স্মরণে "রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ" কর্মসূচি পালন করা হয়। 

০২ আগস্ট, জুমার নামাজের পর "প্রার্থনা ও ছাত্রজনতার গণমিছিল পালিত হয়"। বাংলা র‍্যাপ সংগীত গর্জে উঠে, ইউটিউবে প্রতিবাদী গান রিলিজ করতে থাকে একের পর এক,  তাদের কণ্ঠে সবাই নতুন করে আওয়াজ উঠাতে শুরু করে। আন্দোলন যখন প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে উঠেছিল তখন র‍্যাপাররা সাধারণ মানুষের মনে পুনরায় আন্দোলনের স্পিরিট জাগিয়ে তুলতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিল।

Students movement in Bashundhara Gate

০৩ আগস্ট, ঢাকার আকাশ পরিষ্কার, হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে পুরা বাংলাদেশে বিক্ষোভ মিছিল পালিত হয়। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে লাখ লাখ মানুষ জড়ো হন। যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, রামপুরা, মিরপুর, বসুন্ধরা গেট, মহাখালী ছিল উত্তাল। দেশের প্রতিটি বিভাগ এবং বেশিরভাগ জেলা শহরে ছাত্রজনতা বিক্ষোভ মিছিল করেন। এই দিনেও পুলিশ লীগের গুলিতে অনেকেই নিহত হন। 

Clash between police and students

০৪ আগস্ট, এক দফা দাবিতে সারা দেশে ব্যাপক আন্দোলন এবং ভাঙচুর করা হয়। "পরশু নয় কাল ই লং মার্চ টু ঢাকা" লিখে পোস্ট করে সমন্বায়করা। ৫ই আগস্ট "লং মার্চ টু ঢাকা" কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। রাত থেকে কারফিউ শুরু হয়। হাসিনা নির্দেশ দেয় ছাত্রদের প্রতিহত করতে। সেনাবাহিনী প্রধান ওয়াকার বলেছেন তারা ছাত্র জনতার উপর গুলি চালাবে না। ইউরোপ আমেরিকার কিছু সংস্থা থেকে বলা হয়েছে তারা ৫ই আগস্টের "লং মার্চ টু ঢাকা" স্যাটেলাইট থেকে পর্যবেক্ষণ করবেন। সমন্বায়ক আসিফ মাহমুদ পোস্ট করেন- "দাবানলের সামনে দাঁড়াবেন না, পুড়ে ছাই হয়ে যাবেন",  "যুদ্ধে যাচ্ছি মা, আমাদের জন্য দোয়া করবেন"। এই পোস্টগুলো তখন ফেসবুকে প্রচুর শেয়ার হয়। আর অন্যদিকে ছাত্রলীগের ফুট সোলজারগুলো পোস্ট দিতে থাকে- "৯ দফার পক্ষে ছিলাম, কিন্তু আজ যেটা বললেন সেটার পক্ষে নাই", "জনে জনে খবর দে, এক দফার কবর দে", ইত্যাদি। এদিকে ছাত্রলীগের বড় বড় কর্মীরা পলাতক।

Sheikh Hasina's escape, Mass uprising in bangladesh

৫ আগস্ট, ঢাকার আকাশে মেঘ, সকাল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। কারফিউ চলছে। সেনাবাহিনী ট্যাংক বহর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাস্তায়। এর মধ্যেই সকাল থেকে মানুষ রাস্তায় নামতে শুরু করে। শিক্ষার্থীরা এবং সাধারণ মানুষ মেইন রাস্তায় উঠার চেষ্টা করে। সকাল ৯টার দিকে পুলিশ এবং আর্মি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক হারে গুলি চালায়। অনেকেই আহত এবং নিহত হয়। সকাল ১০টার পর গুলির আওয়াজ শোনা যায়নি। আমরা বসুন্ধরা গেটে একটার দিকে কারফিউ ভেঙ্গে মেইন রাস্তায় উঠে যাই। হাজার হাজার মানুষ জড় হন। প্রত্যেক থানা থেকে পুলিশ পালিয়ে যায়। মাঠে শুধু সেনাবাহিনী থাকে। সেনাবাহিনী প্রধান ওয়াকার তিনটার দিকে ঘোষণা দেয় হাসিনা পদত্যাগ করেছে। লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। আমার মনে হয়েছে এদিন ঢাকা শহরের প্রতিটি মানুষ একসাথে বের হয়ে সেলিব্রেট করেছে। এটা ঈদের আনন্দের চেয়েও বেশি ছিল। শুধু যারা অসুস্থ এবং কাপুরুষ তারাই বাসা থেকে বের হয়নি। হাসিনার পদত্যাগের ঘোষণার পর সবাই শাহবাগ এবং গণভবনের দিকে জড় হতে থাকে। সাধারণ জনগণ সংসদ ভবন এবং গণভবনে ঢুকে পড়ে। বিভিন্ন সরকারি ভবনে আগুন দেয় জনতা। পুলিশের বেশিরভাগ থানা পুড়িয়ে দেওয়া হয়। অস্ত্র লুট করা হয়। পুলিশ ইউনিফর্ম খুলে পালিয়ে যায়। যারা পালাতে পারেনি তারা গণধোলাইয়ের শিকার হয়। সেনাবাহিনী শেল্টার না দিলে কোনো পুলিশই জানে বাঁচতে পারতো না। রাষ্ট্রপতি চুপ্পুর সাথে জামাত এবং বিএনপির নেতারা বৈঠক করেন। সেনাবাহিনী প্রধান ওয়াকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের ঘোষণা দেন। আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ বড় বড় নেতারা দেশত্যাগ করে। যারা পালাতে পারেনি তারা গা ঢাকা দেয়। বেশিরভাগ আওয়ামালীগের নেতাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয় সাধারণ মানুষ। শেখ হাসিনার পলায়নে সারাদেশের মানুষ উৎসবের মত পালন করেন।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url