হিংসা

স্বৈরাচার হাসিনা মনে মনে একটা নোবেল পাওয়ার আশা করেছিল। আশা করাটা দোষের কিছু না। কিন্তু সে ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে দেশে জায়গা দিয়ে দেশের মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়েছে। নোবেল কমিটি বোকা নয়। তারা হাসিনার মতলব ধরে ফেলেছে। তারা হাসিনাকে নোবেল প্রাইজের জন্য যোগ্য মনে করেনি। এদিকে ডক্টর ইউনূস অলরেডি শান্তিতে নোবেল প্রাইজ পাওয়া লোক। সারা বিশ্বের মানুষ ডক্টর ইউনূসকে সম্মান করে। বাংলাদেশে দারিদ্র্য দূরীকরণে ডক্টর ইউনূসের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। হাসিনা হিংসা করতো ডক্টর ইউনূসকে। বিভিন্ন সময় ডক্টর ইউনুসকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করতো। স্বৈরাচার হাসিনা ক্ষমতার অপব্যবহার করে ইউনূসকে বিভিন্নভাবে কষ্ট দিয়েছে। হাসিনা ইউনূসের র‍্যাপুটেশন ধ্বংস করতে চেয়েছিল। হাসিনার নেক্সট মিশন ছিল ডক্টর ইউনুসকে পুরোপুরিভাবে ধ্বংস করে দেওয়া। কিন্তু মানির মান আল্লাহ রক্ষা করে। হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিশাবে দেশ পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশের মানুষ আন্দোলন করে স্বৈরাচার হাসিনার পতন ঘটায়। চোরের মত দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয় হাসিনা। রাতারাতি একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের কার্যক্রম শুরু হয়। দেশের মানুষ ইউনূসকে সরকার প্রধান হিশাবে দেখতে চায়। ইউনূস সাধারণ মানুষের অনুরোধে সাড়া দেয়। ডক্টর ইউনূস এখন (২০২৪) বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। কার্মা ইজ অ্যা বিচ। হাসিনা ইউনুসকে ফাঁদে ফেলতে গিয়ে নিজেই ফাঁদে পড়ে যায়। হাহা। হিংসুকদের জীবনের শেষ পরিণতি এমনই হয়। 

হিংসা, ঈর্ষা এবং পরশ্রীকাতরতা এই শব্দগুলো কাছাকাছি অর্থবহ করলেও তাদের মধ্যে কিঞ্চিৎ পার্থক্য বিদ্যমান রয়েছে। ঈর্ষা ভাল জিনিস। কিন্তু হিংসা এবং পরশ্রীকাতরতা খারাপ।

হিংসা হলো কারো সম্পদ, জ্ঞান, প্রতিপত্তি বা সফলতা দেখে নিজের অন্তরে দহনজ্বালা অনুভব করা এবং মনে প্রাণে তার ধ্বংসের আকাঙ্ক্ষা করা সাথে নিজের জন্য তা কামনা করা। তবে এখানে নিজের কামনার ব্যাপারটি আবশ্যক নয়। অপরদিকে ঈর্ষা হলো অন্যের ভালো বিষয়ে নিজের জন্য ঐরূপ আশা করা। এখানে অন্যের ক্ষতির কামনা থাকে না।

হিংসা থেকে নিজেকে সেইফ রাখার দরকার আছে। হিংসুকদের চেনার উপায় এবং হিংসাত্মক আক্রমণ থেকে বাঁচার উপায় নিয়ে এই লেখায় আলোচনা করবো। 

হিংসা জিনিসটা বেশিরভাগ সময় সমগোত্রীয়দের মধ্যে বেশি কাজ করে। আত্মীয়স্বজন, অফিসের কলিগ এবং বন্ধুদের মধ্যে এইটার প্রবণতা বেশি।

যারা জন্মগতভাবে কোনো বার্তি সুবিধা নিয়ে পৃথিবীতে আসে এবং লাইফে তার যথাযথ ব্যবহার করে, তারা যেখানেই যাক না কেন হিংসা এদেরকে সবসময় গোপনে অনুসরণ করবে। 

কেউ নিজেকে হিংসুক হিসাবে স্বীকার করতে চায়না। সবাই মনে করে অন্যরা হিংসুক। কিন্তু এটি সত্য নয়। আমাদের সবার মধ্যেই হিংসা জিনিসটা প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান রয়েছে। আমরা যখন কাউকে নিজের চেয়ে বেশি সফল হতে দেখি তখন স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মধ্যে হিংসার অনুভূতি জেগে ওঠে।

আমাদের একটি সহজাত প্রবৃত্তি হচ্ছে নিজেকে সবসময় অন্যের সাথে তুলনা করা। যেকোনো মানুষকে আমরা একটি লেভেল দিয়ে বিবেচনা করতে সাচ্ছ্যন্দ বোধ করি।

অজানা বিষয়ে আমাদের মধ্যে একটি ভয়ের আশঙ্কা কাজ করে। প্রাণী হিশাবে আমরা সাব-কনশাসলি ইন্সিকিউর্ড টাইপ। আমরা সবসময় নিরাপদে থাকতে চাই। তাই নতুন কারো সাথে পরিচিত হওয়ার সময় আমরা তার সোশ্যাল স্ট্যাটাস সম্পর্কে জানতে চাই। অনিরাপত্তাবোধ থেকে আমাদের মনে হিংসার অনুভূতি তৈরি হয়। ইন্সিকিউর্ড টাইপের লোকদের মধ্যে হিংসার অনুভূতি বেশ প্রকট। 

মানুষের মধ্যে হিংসার অনুভূতি শনাক্ত করা খুব কঠিন, কারণ মানুষ যখন হিংসা অনুভব করে, তখন সে এই অনুভূতিটা দ্রুত লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। হিংসা নেতিবাচক অনুভূতি তাই কেউ চায়না এটি প্রকাশিত হোক। 

তবে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে হিংসার অনুভূতি শনাক্ত করা যায়। 

তুমি যখন কাউকে একটা গুড অথবা ব্যাড নিউজ দিবে তার মুখের অঙ্গভঙ্গির দিকে খেয়াল করবে। সে হয়ত খুশি হবে অথবা নারাজ হবে। হিংসুকদের ক্ষেত্রে অনুভূতিটা হবে উলটো। যেমন গুড নিউজ দিলে তারা নারাজ হবে। ব্যাড নিউজ দিলে তারা খুশি হবে। তবে এই অনুভূতিটা তারা মাইক্রো সেকেন্ডের মধ্যে লুকিয়ে ফেলবে।

হিংসুকদের মধ্যে অন্যের বন্ধু হয়ে ক্ষতি করার প্রবণতা রয়েছে। কেউ যখন প্রথম পরিচয়ে তোমার সাথে খুব বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করবে তার মানে তারা তোমার ঘনিষ্ঠ হয়ে তোমার ক্ষতি করতে চায়। হিংসুকরা আমাদের বেস্ট ফ্রেন্ড হওয়ার ভাণ করে, আমাদের দূর্বলতাগুলো জানার চেষ্টা করে এবং তলে তলে আমাদের ক্ষতি করার ষড়যন্ত্র করে। আবার অনেকেই আছে ভাল যারা আসলেই তোমার ভাল বন্ধু হতে চায়। সমমনাদের মধ্যে এরকম আচরণ দেখা যায়। তোমাকে এই দুই শ্রেণীর মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে।

হিংসাত্মক আক্রমণ সবচেয়ে বেশি ডেঞ্জারাস। কারণ কেউ যখন রাগান্বিত হয়ে তোমাকে আক্রমণ করে সেইটা তুমি বুঝতে পারবে কিন্তু কেউ যখন হিংসা থেকে তোমাকে আক্রমণ করবে তখন সেইটা তুমি সহজে বুঝতে পারবে না। এইটা তোমাকে মানসিকভাবে অনেক বেশি ক্ষতি করে। কারণ হিংসুকরা কখনো সরাসরি আক্রমণ করে না, তারা বিভিন্ন পরোক্ষ উপায় খুঁজে বের করে তোমার ক্ষতি করার জন্য, এবং তারা নিজেকে সন্দেহের বাইরে রাখতে সফল হয়। তাই যখন কারো চাকরি চলে যায়, সম্পর্কে বিচ্ছেদ হয়, সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তখন সে বুঝতে পারে না তার সাথে কেন এইরকম হইলো, সবকিছুর জন্য সে নিজেকেই দোষারোপ করে এবং তার এই ক্ষত সারতে বছরের পর বছর সময় লেগে যেতে পারে। তুমি যদি শুরুতেই হিংসাত্মক আক্রম শনাক্ত করতে পারো তাহলে ক্ষত কাটিয়ে উঠতে তোমার জন্য অনেকটা সহজ হবে।

তুমি যখন কোনো কিছুতে সফল হবে তখন হিংসুকরা বিভিন্নভাবে তোমার ক্ষতি করার চেষ্টা করবে, তোমার নামে বদনাম ছড়াবে, বা সুযোগ পেলে সরাসরি ক্ষতি করবে। কিন্তু তারা স্বীকার করবে না হিংসার কারণে তারা তোমার ক্ষতি করেছে বরং তারা তোমার একটি দোষ খুঁজে বের করবে এবং তার জন্য তোমাকে দায়ী করবে। 

হিংসুকদের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য কিছু প্রটেকশন রয়েছে যেগুলো ব্যবহার করে তুমি নিজেকে সেইফ রাখতে পারো।

তুমি লাইফে যত বেশি এগিয়ে যাবে তত বেশি হিংসার মুখোমুখি হবে। তুমি চাইলেও এটি রোধ করতে পারবে না। তুমি যদি কোনো একটি বিষয়ে এক্সপার্ট হয়ে থাকো তাহলে সেটা নিয়ে কখনো অহংকার করবে না। মাঝেমধ্যে অন্যান্য বিষয়ে নিজের ছোট খাট দুর্বলতা প্রকাশ করতে পারো। এই ক্ষেত্রে নিজের স্টুপিডিটি নিয়ে স্ব-অপমানজনক হাস্যরস বেশ কাজের। এতে তোমার সম্পর্কে মানুষের মধ্যে একটি মিশ্র অনুভূতির সৃষ্টি হবে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত আক্রমণ থেকে কিছুটা হলেও সেইফ থাকবে।

যেমন রিসেন্টলি আমি ফেসবুকে একটা পোস্ট শেয়ার করি - "পুরো একটা দেশ জয় করে ফেললাম কিন্তু একটা মন জয় করতে পারলাম না।" এতে আমার স্বৈরাচার পতনে ভূমিকা রাখার অর্জন এবং অন্যদিকে একটা গার্লফ্রেন্ড বানাইতে না পারার ব্যর্থতা, দুইটা মিলে মানুষের মধ্যে একটা মিশ্র অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছে। এটা জাস্ট উদাহরণ দেওয়ার জন্য বললাম। শুনতে সিলি মনে হলেও এটা বেশ কাজের। হাহা।

মানুষ নিজের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান কাউকে সহজে গ্রহণ করতে পারে না। যারা কথায় কথায় জ্ঞান জাহির করে তাদেরকে মানুষ পছন্দ করে না। তুমি নিজেকে কখনো বেশি বুদ্ধিমান হিসাবে প্রেজেন্ট করার চেষ্টা করবে না। লক্ষ্য রাখবে তোমার উপস্থিতিতে অন্যরা যেন কখনো নিজেকে তুচ্ছ অনুভব না করে। 

পার্ফেকশন মানুষের হিংসাকে ট্রিগার করে। সবসময় সবজায়গায় নিজেকে খুব বেশি পার্ফেক্ট হিশাবে উপস্থাপন করার প্রয়োজন নেই।

ইন্সিকিউর্ড টাইপের লোকদের সাথে ডিল করার সময় মাঝেমধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে তাদের থেকে পরামর্শ নিবে, বিভিন্ন ইস্যুতে মতামত জানতে চাইবে, তারা যেন তোমার উপস্থিতিতে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসাবে অনুভব করে।

কর্মক্ষেত্রে প্রায় সময় সফলতা অর্জন করে থাকলে তার জন্য অন্যদের প্রাপ্য ক্রেডিট দিবে। বড় ধরনের সফলতা অর্জন করলে বন্ধু অথবা কলিগদের ট্রিট দিবে। তুমি নিজের সফলতার জন্য প্রকাশ্যে খুব বেশি গর্ব করবে না বরং এটিকে সৌভাগ্যের বিষয় হিসাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করবে। 

তোমার কাজ হচ্ছে মানুষের মধ্যে হিংসার উপাদানগুলো পর্যবেক্ষণ করা এবং তারা তোমার ক্ষতি করার পূর্বেই সচেতন হয়ে যাওয়া।

ইচ্ছাকৃতভাবে কখনো অন্যের মনে হিংসার অনুভূতি জাগিয়ে তুলবে না। অন্যের মনে হিংসার অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে পারে এই বিষয়গুলোতে যথেষ্ট সচেতন থাকবে।

তুমি যখন সফলতার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যাবে তখন তোমার এইসব ছোটখাট বিষয়ে অলওয়েজ সচেতন থাকার প্রয়োজন হবে না। কারণ তখন তারা তোমার ক্ষতি করার পরিবর্তে তোমার সাথে ভাল সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইবে। তবে যতদিন না পর্যন্ত সফলতার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে না পারো ততদিন পর্যন্ত হিংসুকদের ব্যাপারে সচেতন থাকার দরকার আছে। সফলতার চূড়ান্ত পর্যায়টি একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। মূলত এইটা হচ্ছে তোমার জন্য একটি নিরাপদ অবস্থান।

লক্ষ্য করলে তুমি নিজের মধ্যেও হিংসার অনুভূতি টের পাবে। তাই প্রথমে তোমার নিজেকে নিয়ে কাজ করা উচিত। কখনো অন্যদের সাথে নিজেকে তুলনা করবে না। অন্যের গ্রেটনেসকে উদারভাবে গ্রহণ করার চেষ্টা করবে। বন্ধুর সফলতাকে নিজের সফলতা হিশাবে বিবেচনা করবে তাহলে প্রতিহিংসা তোমাকে ধ্বংস করতে পারবে না। কারণ হিংসুকদের জীবন খুব কষ্টের। 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url