অস্তিত্ব
শুধুমাত্র তোমার অস্তিত্বই যথেষ্ট।
তুমি যদি অতীতের বাবা মায়ের খারাপ আচরণ, অবহেলা, অপমান, চাইল্ডহুড ট্রমা, ইত্যাদি বেদনাদায়ক স্মৃতি দ্বারা নিজেকে পরিচিত কর তাহলে সেগুলো চিরস্থায়ী হয়ে যাবে। তোমাকে সারাজীবন অতীতের শিকার হয়েই বসবাস করতে হবে। নিজেকে অতীতের দ্বারা প্রভাবিত হতে দিও না। তোমাকে বিশ্বাস করতে হবে যে, তোমার অতীত যতই কঠিন হোক না কেন সবকিছু আবার নতুন করে শুরু করার মত যথেষ্ট জীবনীশক্তি তোমার মধ্যে রয়েছে। এটিকে মেনে নিয়ে নিজেকে মনে মনে বল— "আজ থেকে আমি সুখি হওয়ার চেষ্টা করবো"।
কেউ যদি সবসময় আত্মকেন্দ্রীক চিন্তা করে, তার কারণ হচ্ছে সে ছোটবেলা থেকে যথেষ্ট ভালবাসা এবং আদর যত্ন পায়নি। সে অনুভব করত পৃথিবী কঠিন এবং নির্দয়, তাই তাকে স্বার্থপর হতে হয়েছিল। যদি তোমার জীবনে এরকম স্বার্থপর মানুষের দেখা পাও, যারা তোমার জীবনকে বিষিয়ে তোলে, তাদের অন্তরের ভিতরে গভীরভাবে তাকিয়ে দেখ এবং সে কোন দুঃখের নদী পার হয়ে এসেছে তা বুঝার চেষ্টা কর।
আমরা সবসময় অন্যের রিকগনিশন পেতে চাই। অন্যের কাছ থেকে রিকগনিশন পেলে আমরা সবচেয়ে বেশি মোটিভেটেড হই। আমাদের বেশিরভাগ কর্মকাণ্ডের মূল কারণও এটি।
তোমার সন্তানদের বেশি বেশি সময় দাও, ভাত খাওয়ানোর সময় শুধুমাত্র তাদের প্রতি মনোযোগ দাও, গোসল করানোর সময় তাদের সাথে সুন্দরভাবে কথা বল, রাতে ঘুমানোর আগে তাদেরকে মজার মজার গল্প শোনাও, তারা যখন ঘরে যথেষ্ট ভালবাসা পাবে তখন তা বাইরে খোঁজার চেষ্টা করবে না।
যদি তোমার কোনো একটি সন্তান তার ভাই বোনদের হিংসা করে তাহলে তাকে নিয়ে একটি ট্রিপ দিয়ে আসো। শুধু তোমরা দুজনেই ঘুরতে যাবে। ট্রিপ দেওয়া সম্ভব না হলে তাকে ভাল একটি রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাও, মনোযোগের সাথে তার কথাগুলো শোন। কারণ ছোটবেলায় যারা পর্যাপ্ত এটেনশন পায়না প্রাপ্তবয়সে তাদের মধ্য বিভিন্ন সাইকোলজিক্যাল সমস্যা দেখা দেয়। তবে খুব ছোটবেলা থেকে বাচ্চাদের প্রতি পূর্ন মনোযোগ দেয়ার মাধ্যমে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
সবসময় নিজেকে কিছুটা বিলাসিতার সুযোগ দাও। নিজের জন্য একটি ভাল হেডফোন অথবা একটি স্মার্ট ওয়াচ কিনতে পারো। দামি ব্র্যান্ডের এক জোড়া ভাল জুতা কিনতে পারো যা তোমার লাইফকে কিছুটা হলেও সমৃদ্ধ করবে।
তোমার যে সুন্দর জামাটা শুধুমাত্র কোনো অনুষ্ঠানে পরার জন্য তুলে রেখেছ সেটা মাঝেমধ্যে বের করে জাস্ট নিজের জন্য পর। বাসায় যে জিনিসগুলো গেস্ট আসলেই ব্যবহার করা হয় মাঝেমধ্যে সেগুলো বের করে নিজেও ব্যবহার কর। যেন তুমি নিজেই তোমার বাসার গেস্ট। স্পেশাল মুহূর্তগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে আলাদা নয়। যখন আমরা কোনো কিছুকে স্পেশাল হিসেবে ট্রিট করি তখনই সেটা স্পেশাল মূহুর্তে পরিণত হয়। মাঝেমধ্যে নিজেকে স্পেশালভাবে ট্রিট কর।
মাঝেমধ্যে খুব ছোট খাট জিনিসও আমাদের বেশ উৎফুল্ল করতে পারে। যখন আমি বাজারে বিভিন্ন রঙের ক্যাপ্সিকাম দেখি তখন এরকম অনুভব করি। কিন্তু ইচ্ছা হলেও কিনতে দ্বিধাবোধ করি। এত দাম দিয়ে ক্যাপ্সিকাম কিনবো? সাধারণ মরিচ কিনলেই তো পারি। একটা সংশয় তৈরি হয় মনের মধ্যে। তবে ক্যাপ্সিকাম আমি পছন্দ করি। তাই যখন মাঝেমধ্যে নিজেকে ট্রিট দেয়ার জন্য কিনে ফেলি তখন বেশ আনন্দিত বোধ করি। তাছাড়া ক্যাপ্সিকামে একটি কমলার চেয়েও বেশি ভিটামিন 'সি' রয়েছে।
তুমি যদি নিজেকে পছন্দ কর তাহলে তোমার চারপাশের মানুষকেও তোমার কাছে ভাল লাগবে। আর যদি নিজেকে ঘৃণা কর তাহলে চারপাশের মানুষদেরকেও তোমার কাছে বিরক্ত লাগবে। চাইলে তুমি তোমার নিজেরই সেরা ফ্যান হতে পারো। নিজেকে পছন্দ করার চেষ্টা কর। তুমি নিজের সাথে নিজে সুখি থাকতে পারলে অন্যদের সাথেও সুখি থাকতে পারবে।
কাউকে হেল্প করলে নিজেকে পছন্দ করতে সহজ হয়। আমি যখন কাউকে বিপদে হেল্প করতে পারি তখন আমার নিজের প্রতি এক ধরনের ভাল লাগা কাজ করে। যদি মনে হয় তোমার আত্মবিশ্বাস কমে যাচ্ছে তাহলে অপরিচিত কাউকে হেল্প করার চেষ্টা কর। এতে তুমি নিজেকে পছন্দ করতে শুরু করবে। ফলে তোমার আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে।
একটি পণ্যের গায়েও লেখা থাকে "লিমিটেড এডিশন", যার হয়তো একই রকম দেখতে একশ কিংবা ৫০০টি কপি রয়েছে। কিন্তু তুমি মাত্র একজনই আছ এই পৃথিবীতে। কারণ প্রতিটি মানুষই আলাদা। সবার মধ্যেই ভিন্ন ভিন্ন প্রতিভা রয়েছে। তোমার এই আলাদা সত্ত্বাটিকে আনন্দের সাথে গ্রহণ করে নাও।
যখন তোমার বিবেক তোমাকে বলে "এই লোকটাকে ঘৃণা কর না। এই লোকটাকে মাপ করে দাও। এতে তোমার নিজের জন্যেই ভাল হবে। বন্ধুর সফলতা দেখে হিংসা কর না।" কিন্তু বেশিরভাগ সময় আমরা বিবেকের কথা শুনি না। আমাদের মন বিভিন্ন সময়ে আমদের ভিতরে নেতিবাচক আবেগ অনুভূতির সৃষ্টি করে যেগুলো আমরা কন্ট্রোল করতে পারি না। এমন সময়ে, যদি মনে হয় কোনো সমস্যার সমাধান করা তোমার পক্ষে সম্ভব নয়, তাহলে তখন প্রার্থনা করতে পারো। বিনয়ের সাথে সাহায্য কামনা করতে পারো তোমার রবের কাছে অথবা এই মহাবিশ্বের কাছে। প্রার্থনার গোপন শক্তি রয়েছে।
মাঝেমধ্যে মানুষ ঘৃণার মাধ্যমে তার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে। যখন কারো প্রতি তোমার মনে ঘৃণা জন্মায় তাহলে নিজের ভিতরে তাকিয়ে দেখ। এবং নিজেকে প্রশ্ন কর- এই ঘৃণার প্রকৃত কারণটি কি? মানুষ চাঁদের বুকে পদচিহ্ন এঁকে দিতে সক্ষম হয়েছে কিন্তু নিজের মনের গভীরে প্রবেশ করতে ব্যর্থ। অথচ এটিই আমাদের সবচেয়ে নিকটে অবস্থিত এবং যেখানে প্রবেশ করা সবেচেয়ে বেশি জরুরী। আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আমরা একটি নীরব ঘরে আধা ঘণ্টার জন্য নিজের সাথে বসে থাকতে পারি না। কিন্তু আত্মসচেতনা বৃদ্ধির জন্য মাইন্ডফুলনেস একটি কার্যকরী পদ্ধতি। আমাদের নিজেকে বুঝতে হবে সবার আগে।
যদিও অন্যদের কথা আমাদের এড়িয়ে চলা উচিৎ নয় তবুও ডিসিশন মেকিংয়ের ক্ষেত্রে এটি সম্পূর্ন আমাদের নিজের উপর নির্ভর করে। অন্যদের কথা শুনে সিদ্ধান্ত নিলে পরে আফসোস করতে হয়, তাই নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়াই ভাল। নিজের উপর বিশ্বাস রাখ।
সিদ্ধান্ত নিতে যত বেশি দেরী করবে সেটি ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি হবে। কোনো একটা কাজ করার আগে যদি বেশি দুশ্চিন্তা কর তাহলে কাজটি তো ঠিকভাবে করা হবেই না, উল্টো গুবলেট পাকিয়ে ফেলবে। তোমার জাহাজ সাগরে যাওয়ার পরিবর্তে পাহাড়ে গিয়ে ধাক্কা খাবে। সবসময়য় নিজের ইন্টুইশনের উপর ভরসা রাখবে এবং তোমার ইন্টুইশন তোমাকে যেদিকে পথ নির্দেশ করে তুমি তোমার বহর নিয়ে সেদিকে যাত্রা শুরু করবে। তাহলেই তুমি তোমার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে।
যখন কোনো একটি গুরুতপূর্ন বিষয়ে তুমি কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারো না তখন উত্তর হচ্ছে "না"। আমার কি এর সাথে প্রেম করা উচিত? আমার কি এখন বিয়ে করা ঠিক হবে? আমার কি ওখানে যাওয়া উচিৎ? এসব ক্ষেত্রে যদি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারো, তাহলে সর্বদায় উত্তর হচ্ছে - না।
যখন তুমি বুঝতে পারবে কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমাকে একটি ঝড় তুফানের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। তখন অল্প সময়ের জন্য একটি ব্রেক নাও। পাঁচ মিনিট অথবা দশ মিনিটের জন্য জাস্ট নীরব একটি রুমে নিজের সাথে সময় কাটাও। অতীত এবং ভবিষ্যতের চিন্তা বাদ দিয়ে জাস্ট নিজের শ্বাস প্রশ্বাসের দিকে মনোযোগ দাও। রুমের মধ্যে যে ফাঁকা স্থান রয়েছে সেটিকে উপলব্দি করার চেষ্টা কর। জাস্ট বর্তমানে উপস্থিত থাকার চেষ্টা কর। নিজেকে বল "যা হওয়ার এই বর্তমান সময়ের মধ্যেই হবে, এই মুহুর্তে যেমন আমি শান্ত রয়েছি, সবসময় একইভাবে শান্ত থাকবো, বাইরের কোনো সমস্যা আমার ভিতরে গণ্ডগোল সৃষ্টি করতে পারবে না, বাইরের সমস্যাগুলো বাইরেই রাখবো।"
লাইফে ছোট ছোট ইম্প্রুভমেন্টগুলোর গুরুত্ব রয়েছে। এগুলো একদিন তোমাকে বৃহৎ পরিসরে অর্জন করতে সহায়তা করবে। স্বল্প পরিসরে হলেও সবসময় চেষ্টা করবে নিজের লাইফের উন্নতি করতে।
নিজেকে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দাও যে তুমি কত কম জান এবং আমাদের এই মহাবিশ্বে এখনো কত রহস্য লুকিয়ে রয়েছে।
তুমি যখন অসীম মহাবিশ্বের দিকে তাকাও আসলে তখন তুমি নিজেকেই দেখতে পাও।
