ভদ্রতা
কলেজে পড়ার সময়ের কথা, আমাদের ক্লাসে একটি দুষ্ট ছেলে ছিল, সে একদিন ক্লাসে ছেলেদেরকে পিছন থেকে কানের লতির নিচে টোকা দিয়ে বিরক্ত করছিল। এই কাজটি করে সে বেশ মজা পাচ্ছিল। কিন্তু অন্যরা প্রতিবাদ করছিল না। কারণ ওরা ভাল ছেলে। এবং দুষ্ট ছেলেটি বেছে বেছে ভাল ছেলেদেরকেই বিরক্ত করছিল। সে যখন আমার সাথে একই কাজ করলো, আমি তখন বেঞ্চ থেকে উঠে গিয়ে তাকে একটা লাত্থি দিলাম। ও সরে গিয়েছিল, লাত্থিটা ভালভাবে গায়ে লাগে নি। তবে এতে ও বেশ ভর্কে গিয়েছিল। তারপর এই দৃশ্য দেখে ক্লাসের অন্যে ছেলেরাও আমার পক্ষে চলে আসল। তারা সবাই বললো- 'একদম ঠিক কাজ করেছিস'। তখন ছেলেটি বুঝতে পারল আমার সাথে ঝামেলা করে সহজে পার পাওয়া যাবে না। ঐদিনের পর থেকে সে আমাকে আর কখনো বিরক্ত করেনি।
যারা সবসময় অন্যের মন মর্জি মত চলে, কাউকে বিরক্ত করে না, নিজের অধিকার চায় না, কেউ অন্যায় করলেও প্রতিবাদ করে না, নিজের সুখ শান্তি বিসর্জন দিয়ে হলেও অন্যের উপকার করে, এরাই সমাজে ভাল মানুষ হিসেবে পরিচিত।
সাধারণত ভাল মানুষেরা ভাল ঘরের সন্তান হয়। ভাল ফ্যামিলি থেকে এদের আগমন। সকালে ঘুম থেকে উঠার পর বাবা মায়েরা তাদেরকে বলে দেন সারাদিন যেন ভাল হয়ে চলে। সবসময় ভাল হয়ে চলার কারণে এদের ছোটবেলা বেশ ভালভাবেই কাটে। কিন্তু বড় হওয়ার পরও তাদের মধ্যে সবসময় ভাল হয়ে চলার প্রবণতা থেকে যায়।
আমি লক্ষ্য করে দেখেছি, ভাল মানুষেরা দুঃসময়ে হতাশ হয়ে পড়ে, কোন সমস্যায় পড়লে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারে না, একটা ঝামেলা থেকে সহজে বের হতে পারে না, সম্পর্কের মধ্যে কোনো ঝামেলা হলে তা আরও জটিল করে তোলে। অভ্যাসবসত নিজেরা প্রথমে স্যাক্রিফাইস করে— ফলে এরা প্রায়সময় হতাশা, ডিপ্রেশন, এবং বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় ভুগে।
সবসময় একটি কথা মনে রাখবে, প্রথমে নিজের সাথে ভাল হও, তারপর অন্যদের সাথে। সবার আগে নিজের সুবিধার কথা চিন্তা করবে, তারপর যদি তোমার সামর্থ্য থাকে তাহলে অন্যদের বিপদে সহযোগিতা করার চেষ্টা করবে।
অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভাল না, তেমনি অতিরিক্ত ভাল হওয়াটাও ভাল না। এমনিতেই আমাদের সোসাইটিতে বিনয়কে দূর্বলতা হিসেবে দেখা হয়।
আমাদের সমাজে অসৎ লোকের সংখ্যা কম নয়, এরা সুযোগ পেলে ভাল মানুষদের ঠকিয়ে দেয়। এরা ভাল ব্যবহার ডিজার্ভ করে না। শুধুমাত্র যারা ভাল ব্যবহারের যোগ্য তাদের সাথেই ভাল ব্যবহার করবে। আর বাকিদের সাথে কঠোর হবে।
কারো বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানো, কেউ সমস্যায় পড়লে তাকে সাহায্য করা, এগুলো মানবিক দায়িত্ব। আমি বলছিনা এগুলো করবে না। আমি বলছি, তুমি নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে কাউকে হেল্প করবে না। কেউ যদি সুখি হতে না পারে, তাহলে এটি তাদের সমস্যা। এটি তোমার কাজ নয় তাদের সুখে থাকার দায়িত্ব নেওয়া।
তুমি ভাল মানুষ হতেই পারো, এটি কোনো সমস্যা নয়, বরং আমাদের সবার উচিৎ ভাল মানুষ হওয়া। পৃথিবীতে প্রতিটি ধর্ম গ্রন্থে আমাদের সর্বদা সাদাচারন করতে বলা হয়েছে। যুগে যুগে ঋষি, মনিষী, দার্শনিক এবং ধর্মগুরুরাও আমাদের একই কথা বলে গিয়েছেন। কিন্তু কেউ যখন তোমাকে নিজের সুবিধার জন্য ব্যবহার করতে চাইবে, তোমার উচিৎ তাকে এড়িয়ে চলা। কেউ যখন তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কিছু চাপিয়ে দিতে চাইবে, তোমার উচিত তাকে কঠোর হস্তে দমন করা।
তোমার ইচ্ছা, আবেগ, অনুভূতি গুলো মনের মধ্যে লুকিয়ে রাখবে না, প্রকাশ করে ফেলবে। তোমার অধিকারের কথা যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করবে। তা না হলে মানুষ তোমার মনের কথা বুঝতে পারবে না। তুমি যদি নিজের ইচ্ছার কথা অপ্রাকাশিত রাখ, মনের মধ্যে চেপে রাখ, তাহলে সেগুলো একসময় বিভিন্ন মানসিক সমস্যা আকারে নিজেদেরকে ভয়াবহ রূপে প্রকাশ করবে।
কুয়োর আবদ্ধ পানি যেভাবে পচে পচে দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং বিষাক্ত হতে থাকে তেমনি অনুভূতি অবদমিত করে রাখলে সেগুলো ধীরে ধীরে আমাদের মনকে নষ্ট করে ফেলে। কিন্তু অনুভূতি প্রকাশ করে ফেললে আমাদের মন পরিষ্কার হয়ে যায়।
সবসময় তোমার নিজের ইচ্ছাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিবে। তোমার মন যা চায় তাই কর। যা করতে বিরক্ত লাগবে তা কখনো করবে না। তুমি নিজেও নিজের কাছে দাস হয়ে উঠবে না।
ভদ্রতার খাতিরে বিরক্তিকর মানুষ বা পরিস্থিতি সহ্য করবে না, তোমার যদি খারাপ লাগে তাহলে সেখান থেকে ত্যাগ কর। চাপে পড়ে নিজের মনের বিরুদ্ধে কিছু করবে না। তুমি যদি তাদের নিজের মনের অবস্থা বুঝিয়ে বল তাহলে তারা তোমাকে অযথা বিরক্ত করবে না। এমনকি পার্টিতে যখন সবাই বিফ বার্গার খাচ্ছে, তখন তুমি চাইলে একটি চিকেন বার্গার নিতে পারো, তুমি যখন নিজের অথেনটিক অনুভূতি প্রকাশ করবে তখন অন্যরা সহজেই তোমাকে এপ্রেশিয়েট করবে এবং তোমাকে আরও বেশি পছন্দ করবে।
ভাল মানুষ হওয়া মানে দূর্বল হওয়া নয়। ভাল মানুষ হওয়া মানে তোমার মধ্যে খারাপ কাজ করার সক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু তুমি তা করো না। কারণ তোমার বিবেক রয়েছে। তোমাকে অনেক খারাপ হতে হবে, একজন মানুষকে ধ্বংস করে ফেলার সব টেকনিক জানা থাকতে হবে যাতে অন্য একজন খারাপ মানুষ তোমার সাথে লাগতে আসলে তাকে উচিৎ শিক্ষা দিতে পারো। প্রতিটি মানুষের ভিতরে একটি হিংস্র পশু ঘুমিয়ে আছে। মাঝেমধ্যে কেউ যখন তীব্র অপমান, রাগ কিংবা বিপদের সম্মুখীন হয় তখন এটি জেগে ওঠে।
তুমি ইচ্ছা করলেও সবসময় বিনয়ী থাকতে পারবে না। তাই মাঝেমধ্যে নিজের ভিতরে হিংস্র পশুটিকে জাগিয়ে তুলতে হবে। তবে এটি যেন তোমার নিয়ন্ত্রণে থাকে। যখন খারাপ মানুষেরা বুঝতে পারবে তোমার সাথে ঝামেলা করে পার পাওয়া যাবে না তখন তারা তোমাকে বিরক্ত করবে না।
এই দুনিয়া হচ্ছে শক্তের ভক্ত নরমের জম। তাই তোমাকে শুধু ভাল মানুষ হলেই চলবে না, একইসাথে একজন শক্তিশালী মানুষ হতে হবে।
