মাইন্ডসেট

তুমি তোমার অধঃপতনের জন্য যে কাউকে দোষারোপ করতে পারো, তোমার মা-বাবাকে অথবা তোমার পরিস্থিতিকে, কিন্তু এটি হয়তো তোমার নিজের মানসিকতা বা তোমার মাইন্ডসেট অথবা এটিউড, যা তোমার অধঃপতনের জন্য দায়ী।

প্রতিটি ভাল জিনিসের একটি সাইড ইফেক্ট রয়েছে, তুমি একটা গ্যাসলাইট দিয়ে চুলা ধরাতে পারো রান্নার কাজে, আবার একই গ্যাসলাইট দিয়ে তুমি একটি বাড়ি জ্বালিয়ে দিতে পারো, এটি নির্ভর করছে তুমি জিনিসটি কিভাবে ব্যবহার করবে তার উপর। তেমনি আমাদের মন অনেক শক্তিশালী একটি যন্ত্র, এটিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে আমরা নিজেদের উন্নতি করতে পারি, আবার ভুলভাবে ব্যবহার করলে এটি আমাদের ধ্বংস করে দিতে পারে। পৃথিবীতে দুই ধরনের মানুষ আছে, যারা নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করে চলতে পারে আর যারা নিজের মনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। একটি নেতিবাচক মন তোমাকে কখনো একটি ইতিবাচক জীবন দিতে পারবে না, একইভাবে উলটোটাও সত্য।

তুমি যদি এভাবে চিন্তা কর যে "তোমার জিবনের দুরবস্থার জন্য একান্ত তুমি নিজেই দায়ী এবং তোমার মনই সব কিছুর নিয়ন্ত্রণকর্তা" তাহলে তুমি লক্ষ্য করবে যে তোমার বুকের উপর থেকে একটি পাথর সরে গেছে। তুমি একজন আশাবাদী ব্যাক্তিতে পরিণত হবে এবং তোমার মনের প্রশস্ততা অনুভব করতে পারবে। এরকম ইতিবাচক মানসিক অবস্থায় তুমি যেকোন পরিস্থিতিতে স্থিরতা বজায় রাখতে পারবে এবং তোমার জীবনের প্রতিবন্ধকতাগুলো তোমাকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে, তুমি আরও অভিজ্ঞতা অর্জন করার স্পৃহা পাবে। যত বেশি অভিজ্ঞতা অর্জন করবে তত বেশি শিখবে। এছাড়াও তুমি আরও সাহসী হবে, তুমি জীবন নিয়ে পরিকল্পনা করতে উদ্বুদ্ধ হবে, কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি অর্জন করার শক্তি পাবে, তুমি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে এবং সবসময় ঝুঁকি নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে। 

অন্যথায় "তুমি যদি হতাশাবাদী জীবন বেঁচে নাও, সবসময় দুঃখকে ভালবেসে সুখ পাও, নিজের জীবনের ব্যার্থতার জন্য দূর্ভাগ্যকে দোষারোপ কর" তাহলে এমন মানসিক অবস্থায় তোমার কোন উন্নতি হবে না, তুমি সবসময় খারাপ কিছু আশা করতে থাকবে, তোমার মানসিক অবস্থার নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটতে থাকবে। যার ফলে, জীবনের প্রতিবন্ধকতাগুলো তোমাকে আরও দূর্বল করে ফেলবে, তোমাকে আরও অযোগ্য মানুষে পরিণত করবে, তুমি নিজেকে এমন জায়গা আবদ্ধ করে ফেলবে যেখানে সবসময় তোমার জন্য খারাপ কিছুই অপেক্ষা করবে। যেখানে ভয়ঙ্ককর হায়েনারা ওত পেতে লুকিয়ে থাকবে তোমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। তোমার মনোযোগ চলে যাবে সেসব জিনিসের প্রতি যেগুলো তোমার নেই, এতে করে তুমি আরও বেশি হতাশ হয়ে পড়বে, তুমি আফসোস করবে। তুমি নতুন করে স্বপ্ন দেখা তো দূরে থাক উল্টো ব্যর্থতাগুলো অভিশাপ হয়ে তোমার ঘাড়ের উপর চেপে বসবে। 

আবার, তুমি যদি একজন বাস্তববাদী ব্যাক্তি হও তাহলে তুমি একটু ভিন্নভাবে চিন্তা করতে সক্ষম হবে। তখন তুমি আশাবাদী কিংবা হতাশাবাদী কোন দলেই থাকবে না, বরং দুটো দলের মধ্যে তুমি ব্যালেন্স করে চলবে। একজন বাস্তববাদীর চোখে পৃথিবীটা যেমন ঠিক তেমনি। সে কোন কিছুকে খুব অতিরঞ্জিত করে দেখে না, আবার ছোট করেও দেখে না। সবসময় বাস্তব অবস্থাটা বুঝার চেষ্টা করে। একজন বাস্তববাদী ব্যক্তি পৃথিবীর প্রকৃত রূপ দেখতে পারে। সে যেকোন সমস্যা প্র্যাক্টিক্যালি সমাধান করার চেষ্টা করে। বাস্তববাদীর চিন্তা যুক্তি নির্ভর।

তুমি যেকোন লাইফস্টাইল চয়েস করতে পারো, তুমি আশাবাদী জীবন বেছে নিতে পারো অথবা তুমি বাস্তববাদী হতে পারো, এটি তোমার চয়েস। কিন্তু তুমি যদি হতাশাবাদী জীবন বেছে নাও তাহলে একটি নেতিবাচক মানসিকতা থেকে তুমি কখনো পালাতে পারবে না। তাই প্রথমে তোমাকে ইতিবাচক মানসিকতার অধিকারী হতে হবে। তোমাকে ইতিবাচক চিন্তা করতে হবে। একটি ইতিবাচক মানসিকতাই পারে তোমাকে একটি সুন্দর জীবন দান করতে। যখন তোমার কিছু বাজে অভ্যাস থাকে এগুলো তোমার সঠিকভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা কমিয়ে ফেলে। এগুলো তোমাকে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করে। তাই তোমার বাজে অভ্যাসগুলো ত্যাগ করা উচিৎ। কারণ আমাদের শরীর, মন, আত্মা সবাই একে অপরের উপর নির্ভরশীল। যখন তুমি কোন অস্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ কর তখন এটি তোমার শরীরের উপর বাজে প্রভাব ফেলে। শরীর খারাপ হলে মানসিক অবস্থারও অবনতি ঘটে। একইভাবে যখন তুমি নেতিবাচক তথ্য গ্রহণ কর, নেতিবাচক চিন্তা কর, সেগুলো তোমার মনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, মন খারাপ থাকলে শরীরেও কোন শক্তি পাওয়া যায় না, শরীর দূর্বল হয়ে পড়ে, ফলে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি পাওয়া যায় না। এতে করে নিজের জীবনে দুর্দশা নেমে আসে এবং তা অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পরে ছোঁয়াচে রোগের মত। সুতরাং নেতিবাচকতা থেকে দূরত্ব বজায় রাখো এবং ইতিবাচকতাকে আলিঙ্গন করে এটিকে জিবনের অংশ বানিয়ে ফেলো।

অথবা তুমি নেতিবাচকতাকে এড়িয়ে চলতে পারো, তুমি যখনই কোন নেতিবাক বিষয় সনাক্ত করতে পারবে, যখনই বুঝতে পারবে এটি তোমার জন্য ক্ষতিকর, তখনই সেটাকে পুরোপুরিভাবে এড়িয়ে চলতে পারো। এতে করে তুমি নেতিবাচকতার অসীম চক্রটি থেকে মুক্তি পাবে। যদিও নেতিবাচকতার অসীম চক্রটি থেকে মুক্তি পাওয়া বেশ কঠিন একটি কাজ কারণ এটি একটি ভয়াবহ ফাঁদ। তবে নিয়মিত চেষ্টার মাধ্যমে তুমি এটি থেকে মুক্তি পেতে পারো। 

তুমি কিভাবে তোমার দুশ্চিন্তাগুলো থেকে মুক্তি পেতে পারো? তোমার দুশ্চিন্তাগুলো থেকে পুরোপুরি মুক্তি পেতে কিছুটা সময় লাগবে। তবে ধৈর্য্য ধরে অনুশীলন করতে পারলে তুমি এর সুফল সারাজীবন ভোগ করতে পারবে। তুমি দিনের একটি সময় ঠিক করতে পারো। যেই সময়টা থাকবে শুধু দুশ্চিন্তা করার জন্য। এটি একটি সাইকোলজিক্যাল পদ্ধতি এবং বেশ কাজের, আমি নিজেই এর সুফল পেয়েছি। দুশ্চিন্তা করার সময়টা সকালের দিকে সেট করলে ভাল হয়। কারণ তখন তোমার শরীরে ভাল এনার্জি থাকে। অথবা তোমার সুবিধামত সময় সেট করতে পারো, এতে কোন সমস্যা নেই। দুশ্চিন্তার সময়টি প্রতিদিন এক ঘণ্টার জন্য সেট করলে ভাল। দুশ্চিন্তার সময়টিতে তুমি জাস্ট চোখ বন্ধ করে তোমার যেভাবে আরাম লাগে সেভাবে বসে থাকবে। মাথায় যেকোন চিন্তা আসবে, তোমার অতীত কিংবা ভবিষ্যতের চিন্তা আসবে, তোমার হয়তো খারাপ লাগবে, তুমি শুধু চিন্তাগুলোকে পর্যবেক্ষন কর, চিন্তাগুলোকে সতস্ফুর্তভাবে আসতে দাও। এভাবে প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা করে এক মাস কন্টিনিউ করে দেখ ফলাফল কি হয়। একটা সময় আসবে যখন তোমার মাথায় আর কোন চিন্তা আসবে না। তখন তুমি একদম শূন্যতা অনুভব করবে। বুদ্ধ এটিকে বলেছেন মনশূন্য অবস্থা। যেখানে তোমার মনের কোন অস্তিত্ব বিরাজ থাকবে না, তবে তুমি পূর্ন সচেতন থাকবে। এমন একটি মানসিক অবস্থায় তুমি নিজের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারবে, তুমি দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পাবে। শুধু তাই নয়, তুমি আরও ভাল ভাল এবং জটিল চিন্তাভাবনা করতে পারবে। তোমার ক্রিটিক্যাল চিন্তা করার শক্তি বৃদ্ধি পাবে। এতে করে তোমার লাইফ থেকে সমস্যাগুলো চিরতরে দূর হয়ে যাবে না, জিবনে সমস্যা আসবে, তবে তখন তুমি সমস্যা দেখে নিজেকে গুটিয়ে ফেলবে না, ভয় পাবে না বরং সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হবে এবং আনন্দের সাথে প্রতিটি সমস্যা অতিক্রম করে যাবে।

তোমার মন অসীম শক্তির উৎস। এটি কতটা শক্তিশালী তা তুমি কল্পনাও করতে পারো না। তুমি এটাকে যেভাবে প্রশিক্ষণ দিবে এটি সেভাবে কাজ করবে। তুমি এটিকে ভালভাবে ব্যবহার করলে ভাল ফলা পাবে। একইভাবে খারাপ কাজে ব্যবহার করলে খারাপ ফল পাবে। তুমি তোমার মনের উপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নাও। কারণ তোমার জীবনকে সুন্দর করার দায়িত্ব একান্তই তোমার নিজের। জীবন সুন্দর হলে সবকিছুই সুন্দর হবে। তোমার জীবন সুন্দর হলে শুধু তুমিই তার ফল ভোগ করবে, আর কেউ নয়। 

আমি লাইফস্টাইল হিসেবে আশাবাদী হওয়াটাকেই সমর্থন করি। কারণ এতে করে বেঁচে থাকার তাগিদ অনুভব করা যায়। এটি অন্তত নির্ভরযোগ্য। অনিশ্চিয়তার ভয়ে থাকার বদলে এর উপর ভরসা করা যায়। এটি সবার ক্ষেত্রেই কাজ করে কারণ মাইন্ডসেটই হচ্ছে সবকিছু। তাছাড়া একটি সুন্দর জীবনের আশা তোমাকে কাজ করতে অনুপ্রেরণা জোগায়।

একটা কথা সবসময় মনে রাখবে - "যা হয় ভালোর জন্যেই হয়"। যেকোন কিছু ঘটার পিছনে একটা উদ্দেশ্য থাকে। ঈশ্বর রহস্যময় উপায়ে আমাদের সাহায্য করেন। এই বিশ্বাসটি তোমাকে সবসময় কৃতজ্ঞ থাকতে সহায়তা করবে। কৃতজ্ঞতা অনেক বড় একটি মানবিক গুণ। কৃতজ্ঞতা তোমাকে সবসময়য় নতুন কিছু শেখার জন্য আগ্রহী করে তুলবে। আর সবচেয়ে বড় কথা কৃতজ্ঞতা তোমাকে প্রবাহমান থাকার মানসিক শক্তি দিবে। গবেষণায় দেখা গেছে একজন কৃতজ্ঞ ব্যাক্তি অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি মানসিক প্রশান্তি অনুভব করেন।

বেঁচে থাকার জন্য সঠিক বা ভুল রাস্তা বলে কিছু নাই, তোমার জীবনের একমাত্র উদ্দ্যেশ্য হচ্ছে সুখী হওয়া। তাই তোমাকে বেঁচে থাকার জন্য একটি অর্থপূর্ন জীবন বেছে নিতে হবে। অর্থপূর্ন জীবন মানে হচ্ছে নিজের স্বার্থের জন্য অন্যের ক্ষতি না করা এবং এমন একটি পেশা বেঁচে নেওয়া যেটি তোমাকে মানসিক শান্তি দিবে এবং একইসাথে সমাজের মানুষের জন্য উপকারী হবে। একটি অর্থপূর্ন জীবনই পারে তোমাকে মানসিক শান্তি দিতে।

তুমি যদি এখনো জিবনের অর্থ খুঁজে না পাও তাহলে প্রথমে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য সেট কর। কারণ একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য তোমাকে উশৃঙ্খল হওয়া থেকে রক্ষা করবে। তাছাড়া একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সেট করার মাধ্যমে তোমার নিজের নিয়ন্ত্রন থাকবে শুধু তোমার কাছেই, ফলে অন্যরা তাদের চিন্তা দ্বারা তোমাকে প্রভাবিত করতে পারবে না। 

এমন জায়গা থাকার কোন প্রয়োজন নেই যেখানে তোমার কোন মূল্য নেই। সবাই নিজেকে যেমন ভাবে অন্যকেও সেভাবে বিচার করে। সে যেমন সে অন্যকেও তেমনই ভাবে। কিন্তু তুমি সবার মত নও। অন্যদের অনুসরণ নয়, অনুকরণ নয়, অন্যদের থেকে শুধু শিক্ষা বা অনুপ্রেনা নেওয়া যেতে পারে। কারণ অলরেডি যে যার মত হয়ে গেছে, তুমি হবে শুধু তোমার নিজের মত।

সুতরাং নেতিবাচকতা ত্যাগ কর, ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোল, বিশেষ করে যখন তুমি একজন বিনয়ী মানুষ।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url