স্কিজোফ্রেনিয়া : একটি ভয়াবহ মানসিক ব্যাধি
সব ধরনের স্কীজোফ্রেনিক রোগীদের মধ্যে বিশেষ লক্ষণ হলো তারা বাস্তবের সাথে সংযোগ রক্ষা করতে পারে না।
স্কীজোফ্রেনিক রোগীর মধ্যে নানা বৈচিত্র্যের লক্ষণ দেখা যায়।
যেমনঃ চিন্তার অস্বভাবীতা, ভ্রান্ত বিশ্বাস, অলীক প্রত্যক্ষন, বিক্ষুদ্ধ আবেগ, উভয়মুখি আচরণ, আত্মকেন্দ্রিকতা, বাস্তব থেকে অপসারণ, উদাসীনতা এবং বিচার বিবেচনার জ্ঞান লোপ পাওয়া।
স্কিজোফ্রেনিয়া গ্রস্থ রোগীর একটি মাত্র ব্যাক্তিত্ব থাকে। মানে তাদের মাল্টিপল ব্যাক্তিত্ব থাকে না। তবে রোগীর মানসিক অবস্থা প্রায়সময় অতিরিক্ত বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে।
ছোটবেলায় অথবা কিশোর বয়সে স্কিজোফ্রেনিয়া রোগের সূচনা ঘটতে পারে। ছোট সময়কালে এই রোগের চিকিৎসা যদি না হয় তাহলে পরবর্তি সময়ে এ রোগ ব্যাক্তির সারাটি জীবন ধ্বংস করে দিতে পারে। চিকিৎসা শুরু করতে দীর্ঘসময় ব্যয় হলে রোগীকে বছরের পর বছর হাসপালে থাকতে হয়।
স্কিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ
স্কিজোফ্রেনিক রোগীদের মধ্যে প্রধানত তিনটি লক্ষণ দেখা যায়। যেমনঃ চিন্তার অস্বভাবীতা, ভ্রান্ত বিশ্বাস এবং অলীক প্রত্যক্ষন।
রোগী যখন অযৌক্তিক, অপ্রাসঙ্গিক, অস্বাভাবিক চিন্তাভাবনা করে তখন সেটিকে চিন্তার অস্বভাবীতা বলে। স্কিজোফ্রেনিক রোগী যখন কোন চিঠি লিখে, সেটি পড়লে কোন চিঠির অসম্পূর্ণ অংশবিশেষ মনে হবে। স্কিজোফ্রেনিকদের কোন কিছু জিজ্ঞেস করা হলে অদ্ভুত ধরনের উত্তর দিয়ে থাকে।
স্কিজোফ্রেনিক রোগী ব্যাতিত অন্যান্য মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত রোগীদের মধ্যেও ভ্রান্ত বিশ্বাস দেখা যায়। তবে স্কিজোফ্রেনিক ব্যক্তিদের ভ্রান্ত বিশ্বাস উদ্ভট ধরনের হয়ে থাকে। অনেক রোগী মনে করে থাকে যে কোন রহস্যময় শক্তি তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে। অনেকে মনে করে থাকে তাদের হত্যা করার ষড়যন্ত্র চলছে আবার কেউ মনে করে তাকে যন্ত্রপাতি দ্বারা আঘাত করা হচ্ছে।
অলীক প্রত্যক্ষন হলো অবাস্তব কোন কিছুর উপস্থিতি অনুভব করা। যেমন রোগী মনে করতে পারে সে অন্য কারো কণ্ঠস্বর শুনতে পায়, অথবা অন্য কোন ব্যাক্তি বা ভূত দেখতে পায়, যা সে ছাড়া আর অন্য কেউ শুনতে বা দেখতে পায় না। এটাকে হ্যালুসিনেশন বা অলীক প্রত্যক্ষন বলা হয়।
স্কিজোফ্রেনিক রোগী তার চারিপাশের ঘটনাবলি সম্পর্কে উদাসীন থাকে এবং অবেগ প্রকাশের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
স্কিজোফ্রেনিক রোগী কখনও হাসে আবার কখনও কাঁদে, লোকজনের সামনে কাপড়-চোপড় খুলে উলঙ্গ হয়ে পড়ে এবং একই সময়ে এরূপ কর্মের জন্য নিজেকে দায়ী করে। এসব রোগী যাকে আদর-স্নেহ করে তাকে অবিশ্বাসও করতে পারে।
স্কিজোফ্রেনিক রোগীরা নিজস্ব চিন্তাধারার মধ্যে মগ্ন থাকে। বাস্তব অবস্থা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা করে রোগী তার চারপাশে এক দেওয়াল খাড়া করে।
স্কিজোফ্রেনিক রোগী ধীরে ধীরে নিজেকে বাস্তব অবস্থা থেকে সরিয়ে নেয়। এ পৃথিবীর কোন কিছুই তাদের ভাল লাগে না। এমন কি খাদ্যগ্রহণ, নিদ্রা, যৌন চাহিদা ইত্যাদি জৈবিক কার্যাবলির প্রতিও কোন প্রতিক্রিয়া করে না।
এসব রোগীর বিচার ক্ষমতা হ্রাস পায়। কোন একটি বিষয় ভাল কি মন্দ এ ব্যাপারে রোগী কিছুই বলতে পারে না। বিচার বিশ্লেষণ ক্ষমতা হারিয়ে এসব রোগী একটি বিচ্ছিন্ন জীবন অতিবাহিত করে।
স্কিজোফ্রেনিক রোগীরা কাজ কর্মে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। বেঁচে থাকার আনন্দ তাদের থাকে না।
স্কিজোফ্রেনিয়ার প্রকারভেদ
স্কিজোফ্রেনিয়া রোগীদের লক্ষণ অনুযায়ী কয়েকটি প্রকারে বিভক্ত করা হয়। যেমন সহজ ধরনের স্কীজোফ্রেনিয়া, খ্যাপাটে ধরনের স্কিজোফ্রেনিয়া, প্যারানয়েড বা সন্দেহবাদী টাইপ, ইত্যাদি।
সহজ ধরনের স্কীজোফ্রেনিকরা তেমন একটা ঝামেলা করে না, পরিবারের সদস্যরা এদের দেখাশোনা করতে পারে। সাধারণত এরা কোন কাজ তেমন একটা ভালভাবে করতে পারে না, সামান্য একটা সূচ দেখেও ভয় পায়, দায়িত্বহীন এবং ভবঘুরে হয়ে থাকে। এদেরকে অনেকে সাহয্য করার চেষ্টা করে ব্যার্থ হয়।
খ্যাপাটে স্কিজোফ্রেনিক রোগীরা সাধারণত উদ্ভট ধরনের আচরণ করে থাকে। যেমন উদ্ভট প্রকৃতির পোশাক পড়া, অদ্ভুতভাবে অঙ্গভঙ্গি করা, অবাস্তব কোন কিছুর উপস্থিতি অনুভব করা, ইত্যাদি। এসব রোগী মাঝে মাঝে নোংরা গালাগালি করে, অশ্লীল কথাবার্তা বলে। এদের মধ্যে সাবলীল আবেগ থাকে না। কথাবার্তা ও চলেফেরায় তারা খুব উদাসীন।
প্যারানয়েড সন্দেহবাদী স্কিজোফ্রেনিক রোগীদের প্রধান লক্ষণ হল ভ্রান্ত বিশ্বাস। এরূপ ভ্রান্ত বিশ্বাসের প্রেক্ষিতে এসব রোগীরা সন্দেহ প্রবণ হয়ে উঠে। তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাস সমূহের মধ্যে কোন সামঞ্জস্যতা এবং যুক্তিকতা থাকে না। এসব রোগীরা মনে করে যে, অন্যান্য ব্যক্তিরা যা করছে বা বলছে তা সবই তাদের বিপক্ষে। প্যারানয়েড রোগীদের মধ্যে ভ্রান্ত বিশ্বাস থাকে তবে স্কিজোফ্রেনিয়ার কোন লক্ষণ থাকে না। এসব রোগীরা বিপদের পড়ার ভয়ে ঘরের বাইরে যেতে চায় না।
স্কিজোফ্রেনিয়ার কারণ
প্রধানত তিনটি কারণে স্কীজোফ্রেনিয়া রোগটি হতে পারে। এগুলো হচ্ছে - জৈবিক, মনোবৃত্তীয় এবং সামাজিক কারণ।
জৈবিক কারণের ক্ষেত্রে, পরিবার কিংবা আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে কারো স্কিজোফ্রেনিয়া থাকলে এই রোগটি হতে পারে। বিভিন্ন ঔষদের প্রভাবে মস্তিষ্কে রাসায়নিক তারতম্য ঘটলে স্কিজোফ্রেনিয়া হতে পারে।
দৈহিক গঠেনের সমস্যার কারণেরও স্কিজোফ্রেনিয়া হতে পারে।
মনোবৃত্তীয় কারণের ক্ষেত্রে, হতাশা ও মানসিক দন্ধের কারণে স্কিজোফ্রেনিয়া হতে পারে। বয়সের সাথে মানসিক বিকাশ ঠিকভাবে না হলে, যৌন চাহিদা অবদমন করে রাখলে, মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত হলে স্কিজোফ্রেনিয়া হতে পারে। পিতামাতার কঠোর শাসন, অতিরিক্ত যত্ন, অবহেলা ইত্যাদি কারণে ব্যাক্তি স্কিজোফ্রেনিক হতে পারে। বাল্যকালে ভীতিমূলক কোন ঘটনার অভিজ্ঞতা থেকেও স্কিজোফ্রেনিয়া রোগটি হতে পারে।
সামাজিক কারণের মধ্যে একটি সমাজের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস ইত্যাদির প্রভাবে স্কিজোফ্রেনিয়া হতে পারে। সাধারণত উচ্চবিত্তদের চেয়ে নিন্মবিত্তদের মধ্যে স্কিজোফ্রেনিয়া বেশি হয়ে থাকে। কারণ তাদের মধ্যে মানসিক চাপ, হতাশা ও দন্ধ বেশি থাকে। এছাড়াও পরিবারের ত্রুটিপূর্ন শিক্ষা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা, যুদ্ধ প্রভৃতি কারণেও স্কিজোফ্রেনিয়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শুধুমাত্রা কোন একটি লক্ষণ থাকলেই একজন ব্যক্তিকে স্কিজোফ্রেনিক বলা যাবে না। সামাজিক, মানসিক এবং শারীরিক অনেকগুলো কারণ একত্রে কাজ করলে ব্যাক্তির মধ্যে ধীরে ধীরে স্কিজোফ্রেনিয়ার বিকাশ ঘটে।
স্কিজোফ্রেনিয়ার চিকিৎসা
স্কিজোফ্রেনিয়া একটি জটিল প্রকৃতির মানসিক ব্যাধি। স্কিজোফ্রেনিক রোগীরা খুব উগ্র, উত্তেজিত এবং আক্রমনাত্ব আচরণ করতে পারে। সাধারণত স্কিজোফ্রেনিক রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়। বিভিন্ন ঔষদ প্রদানের মাধ্যমে স্কিজোফ্রেনিয়ার চিকিৎসা করা হয়। এছাড়াও বর্তমানে সাইকোথেরাপি দেয়ার মাধ্যমে স্কিজোফ্রেনিয়ার চিকিৎসা করা হয়ে থাকে। তবে এটি একটি ধীর্ঘ মেয়াদী চিকিৎসা পদ্ধতি। সাইকোথেরাপি পদ্ধতি তখনই কার্যকর হবে যখন মনোবিদ রোগীর সাথে ভাল সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবেন। কারণ রোগীর সাথে চিকিৎসকের সম্পর্ক স্থাপিত না হলে স্কিজোফ্রেনিক রোগীদের চিকিৎসা করা সম্ভব হয় না।
