কিভাবে সৃষ্টি হলো আমাদের এই মহাবিশ্ব ?
জিবনে কোন একদিন চলার পথে হঠাত চলতে চলতে মনের মধ্যে একটি প্রশ্ন উদয় হয়, এই যে আমাদের চারপাশে এতকিছু রয়েছে এগুলো কোথায় থেকে আসলো, কে সৃষ্টি করলো, এমন সব প্রশ্ন কখনও না কখনও মনের মধ্যে উদয় হয়নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। মানুষ গাছ কেটে সেটি দিয়ে একটা চেয়ার তৈরি করতে পারে, মাটি দিয়ে ইট তৈরি করতে পারে, বড়বড় দালান কোটা তৈরি করতে পারে, কিন্তু মানুষ তৈরি করতে পারেনা এমন অনেক কিছু রয়েছে আমাদের চোখের সামনে, যেমন মানুষ ইচ্ছা করলে একটা পাখির সদৃশ্য বস্তু তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেটিতে প্রাণ দিতে পারে না, একটি সত্যিকারের পাখি মানুষ কখনও তৈরি করতে পারে না। মানুষ চাইলে একটি চাঁদ, একটি পৃথিবী, সূর্য অথবা একটি নক্ষত্র সৃষ্টি করতে পারে না। এটি মানুষের সীমাবদ্ধতা, কিন্তু সে প্রশ্ন করতেই থাকে- আচ্ছা আমি যদি এগুলো সৃষ্টি করে না থাকি, তাহলে কিভাবে এগুলো সৃষ্টি হলো, কোথায় থেকে এলাম আমরা, পৃথিবীটা কিভাবে সৃষ্টি হলো, কে এগুলির স্রষ্ঠা? সেই প্রাচীনকাল থেকেই দার্শনিকরা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা করে আসছেন, তাদের এই প্রশ্ন গুলোর সূত্র ধরে দর্শন বিষয়টি এসেছে, তা আরও পরিশুদ্ধ হয়ে বিজ্ঞানে রূপ নিয়েছে। আধুনিক পদার্থবীজ্ঞানীদের থিওরি এবং গবেষণালব্দ ফলাফল অনুযায়ী বলা যায় যে একেবারে শূন্য থেকে আমাদের এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি হওয়া সম্ভব। কিন্তু একেবারে শূন্য থেকেই কিভাবে কোন কিছু সৃষ্টি হতে পারে?
মহাবিশ্বের যেসকল বস্তু আমরা দেখতে পারি, ধরতে পারি, ছুতে পারি, নাড়াচাড়া করতে পারি, সেইসব বস্তুকে বলা হয় সাধারণ পদার্থ, এইসব পদার্থ সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ভাল ধারণা রয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের ধারণা এসব পদার্থ ছাড়াও মহাবিশ্বে এমন এক ধরনের পদার্থ রয়েছে যে পদার্থটি সম্পর্কে আমাদের তেমন কোন ধারণ নেই, আমরা এটি সম্পর্কে তেমন কিছু জানতে পারি না, এটি ধরা যায় না ছোঁয়া যায় না, এমনকি দেখাও যায় না, কিন্তু এর অস্তিত্ব সম্পর্কে শুধু ধারণা করা যায়। আজব ধরনের একটি পদার্থ এই ডার্ক ম্যাটার। এটি আলোর সাথে কোন মিথস্ক্রিয়া করে না, এটি আলো শোষন করে না এবং আলো প্রতিফলনও করে না। বড়োই রহস্যময় এক বস্তু ডার্ক ম্যাটার।
ভাত খেলে আমাদের দেহে বল পাই, শক্তি বাড়ে, কিন্তু শক্তি বলতে আসলে আমরা কি বুঝি, তা কি তুমি বলতে পারো? শক্তির বিভিন্ন রূপ রয়েছে। শক্তি এক রূপ থেকে অন্য রূপে পরিবর্তিত হয়। কিন্তু শক্তির কখনও বিনাশ হয় না। ভাতের মধ্যে যে শক্তি লুকিয়ে ছিল সেটি তোমাকে কাজ করার ক্ষমতা দিয়েছে। আবার তোমার কাজটি কোন না কোনভাবে শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছে। বিষয়টি কি বুঝতে পেরেছো? একটি বস্তু বা অনেক গুলো বস্তু যে শক্তি হারায়, অন্য এক বা একাধিক বস্তু ঠিক একই পরিমাণ শক্তি গ্রহণ করে। নতুন করে কোন শক্তি সৃষ্টি হয় না বা শক্তি ধ্বংস হয়ে কমেও যায় না। মোটামুটিভাবে শক্তির নয়টি রূপ দিয়ে প্রাকৃতিক সব ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। এই যেমন চৌম্বক শক্তি, তড়িৎ শক্তি, সৌর শক্তি ইত্যাদি। কিন্তু এছাড়া মহাবিশ্বে আরেক ধরনের শক্তি রয়েছে, যার সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা এখনও কিছুই বলতে পারে না, তারা শুধু বলতে পারে এমন একটি শক্তির অস্তিত্ব রয়েছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ডার্ক এনার্জি। এটি কি ধরনের শক্তি, এর বৈশিষ্ঠ্য সম্পর্কে তেমন কিছুই বলা যায় না। তবে কয়েকটি থিওরি রয়েছে ডার্ক এনার্জি বিষয়ক, সেই থিওরিগুলো অনুযায়ী এটিকে শূন্য বা ফাঁকা স্থানের একটি বৈশিষ্ঠ্য যা দুটি বস্তুকে ঠেলে দিয়ে তাদের মধ্যে আরও ফাঁকা জায়গা তৈরি করে। ঠিক মহাকর্ষ বলের বিপরীত। কারণ মহাকর্ষ বলের কাজ দুটি বস্তুকে আকর্ষণের মাধ্যমে কাছাকাছি নিয়ে আসা।
আমাদের সমস্ত মহাবিশ্বের প্রায় ৭০ ভাগ ডার্ক এনার্জি দিয়ে তৈরি, ২৫ ভাগ ডার্ক ম্যাটার এবং বাকি ৫ ভাগ হচ্ছে সাধারণ পদার্থ দিয়ে তৈরি। অর্থাৎ আমাদের এই মহাবিশ্বের সকল বস্তু যেমন গ্রহ, নক্ষত্র, চাঁদ, পৃথিবী সব কিছুই মাত্র পাঁচ ভাগ পদার্থ দিয়ে তৈরি। আর বাকি ৯৫ ভাগই হচ্ছে ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি, যেগুলো সম্পর্কে আমাদের কোন ধারণাই নেই এখন পর্যন্ত।
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ১৯২৯ সালে বিজ্ঞানী হাবল তার টেলিস্কোপ দিয়ে পর্যবেক্ষন করে দেখেন যে আমাদের গ্যালাক্সির চারপাশের গ্যালাক্সি গুলো দূরে দূরে স্বরে যাচ্ছে। এটি দেখে সে তো অবাক হয়ে গালে হাত দিয়ে বসে পড়লো। তিনি আরও পর্যবেক্ষন করে বলেছিলেন যে আমাদের মহাবিশ্ব প্রতিনয়ত সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং এই সম্প্রসারণের কাজটি করছে ডার্ক এনার্জি।
আজ থেকে ১৩.৮ বিলিওন বছর আগে আমাদের বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জন্ম হয়েছিলো। বিগব্যাং থিওরি অনুয়ায়ী মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছিলো একটি অসীম তাপমাত্রা ও ঘনত্ত্বের কোন পরম বিন্দুর মহাবিস্ফোরনের মাধ্যামে। সেই পরম বিন্দুটির আয়তন ছিল একটি ফুলস্টপের এক ট্রিলিওন ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম। ঠিক কেমন করে এই বিন্দু মহাবিশ্বটির জন্ম হয়েছিলো তা বিজ্ঞানীরা এখনো বলতে পারে না, তবে এই বিন্দুটির একটি অবিশ্বাস্য প্রসারণ ঘটে, যাকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন "ইনফ্ল্যাশান"। এই প্রসারনটি এতই দ্রুত ঘটেছিলো যে তা আলোর বেগের চাইতেও বেশি ছিল। আলোর বেগ হচ্ছে সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার। আইন্সটাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বানুযায়ী কোন কিছু আলোর বেগের চাইতে দ্রুত যেতে পারে না। তবে এখানে কোন বস্তু বা কোন তথ্য আলোর চাইতে দ্রুত যাচ্ছে না, এখানে স্থান বা স্পেসের প্রসারণ হচ্ছে আলোর থেকেও দ্রুত গতিতে, এটি হতে পারে। এই অচিন্ত্যনীয়, অবিশ্বাস্য অকল্পনীয় প্রসারণের পর আমাদের বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আকার হলো একটা টেনিস বলের সমান! না আমি মজা করছি না- অচিন্ত্যনীয় প্রসারণের পরও কোনো কিছুর আকার একটা টেনিস বলের সমান হওয়ার অর্থ, শুরুতে এটা ক্ষুদ্র থেকেও ক্ষুদ্র তার থেকেও ক্ষুদ্র ছিল!
মহাবিশ্ব প্রসারণের সঙ্গেসঙ্গে বিকিরণের তাপমাত্রা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। মহাবিস্ফোরনের প্রায় ১ সেকেন্ডের ১০০ ভাগের এক ভাগ সময়ের তাপমাত্রা ছিল ১০০ বিলিয়ন ডিগ্রি। তখন মহাবিশ্বের অধিকাংশই ছিল ফোটন, ইলেকট্রন ও নিউট্রিনো (চরম হাল্কা কনা)। এ ছাড়া ছিল তাদের প্রতিকণাগুলো। এদের সঙ্গে ছিল কিছু প্রোটন ও নিউট্রন। পরের ৩ মিনিটে মহাবিশ্ব শীতল হয়ে এক বিলিয়ন ডিগ্রিতে পৌঁছায়। তখন প্রোটন ও নিউট্রন পরস্পরের সঙ্গে মিলে হিলিয়াম, হাইড্রোজেন ও অন্যান্য হালকা পদার্থের নিউক্লিয়াস গঠন করে। পরের এক লাখ বছর পরে তাপমাত্রা কমে মাত্র কয়েক হাজার ডিগ্রিতে নেমে আসে। সে সময় ইলেকট্রন গুলোর গতি এমনভাবে কমে আসে যে হালকা নিউক্লিয়াসগুলো তাদের আটক করে পরমাণু গঠন করে ফেলে। তবে যেসব ভারি পদার্থ ( যেমন কার্বন ও অক্সিজেন) দিয়ে আমরা তৈরি, সেগুলো গঠিত হয় আরও বিলিয়ন বছর পরে। নক্ষত্রগুলোর কেন্দ্রে হিলিয়াম জ্বালানি পুড়ে গঠিত হয়েছিলো এই মৌলগুলো। মহাবিশ্বের এই আদিম ঘন, উত্তপ্ত চিত্রটি প্রথম প্রস্তাব করেছিলেন বিজ্ঞানী জর্জ গ্যামো। ১৯৪৮ সালে বিজ্ঞানী রালফ আলফারের সঙ্গে যৌথভাবে লেখা এক গবেষণাপত্রে এটি উল্লেখ করেন তিনি। এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণী ছিল। সেটি হলো, আদিম ঐ খুবই উত্তপ্ত অবস্থা থেকে আসা বিকিরণ এখনো আমাদের চারপাশে থাকা উচিত। পদার্থবিদ আর্নো পেনজিয়াস ও রবার্ট উইলসনের কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে ১৯৬৫ সালে তাঁদের ভবিষ্যদ্বাণী প্রমাণ করেন।
তুমি হয়তো ভাবতে পারো শূন্য থেকে মহাবিশ্বের উদ্ভবের ধারনাটা পদার্থ এবং শক্তির নিত্যতার সূত্রের লঙ্ঘন করে। কীভাবে শূন্য থেকে রাতারাতি একটি মহাবিশ্ব তৈরি হয়ে যেতে পারে? ওয়েল... তুমি যদি মহাবিশ্বের সমস্থ ভর হিসেব কর, দেখবে সেটা ধনাত্মক। আর যদি তুমি মহাবিশ্বের মহাকর্ষ ক্ষেত্রের শক্তির হিসেব কর, দেখবে সেটা ঋণাত্মক। যখন তুমি এ দুটিকে যোগ করবে, কি পাবে? শূন্য। তার মানে মহাবিশ্ব তৈরি করতে আলাদাভাবে কোন শক্তির আসলে প্রয়োজন নেই। মহাবিশ্ব ফ্রিতেই পেয়ে যাচ্ছো তুমি। তুমি হয়তো মাথা নেড়ে বলতে পারো না এটি ঠিক নয়। এই যে চারদিকের ধনাত্মক চার্জ আর ঋণাত্মক চার্জ দেখি - কই তারা তো একে অপরকে নিষ্ক্রিয় করে দিচ্ছে না। তাহলে কিভাবে শূন্য থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হতে পারে? ওয়েল... তুমি যদি একইভাবে মহাবিশ্বের যাবতীয় ধনাত্মক চার্জের পরিমাণ এবং ঋণাত্মক চার্জের পরিমাণ ধরে যোগ করো তাহলে দেখবে যোগফোল পাওয়া যাচ্ছে শূন্য! মহাবিশ্বের আসলে কোন নেট চার্জ নেই। আচ্ছা স্পিন বা ঘুর্ণ্নের ব্যাপারেই বা ঘটনা কি? গ্যাল্যাক্সির ঘুর্ণন আছে, তাই না? এবং তাদের ঘুর্ণ্ন হচ্ছে বিভিন্ন ডিরেকশনে। তুমি যদি গ্যালিক্সি গুলোর সমস্ত ঘুর্ণন যোগ কর, তাহলে কি পাবে? শূন্য! সুতরাং মহাবিশ্বের রয়েছে শূন্য স্পিন, শূন্য চার্জ এবং শূন্য এনার্জি। এক কথায় পুরো মহাবিশ্বই শূন্য থেকে সৃষ্টি হতে পারে।
সবকিছুই যদি শূন্য থেকে সৃষ্টি হয়, কেউ যদি মহাবিশ্ব সৃষ্টি না করে তাহলে মানুষের জিবনের প্রকৃত অর্থ কি? প্রথমত বিজ্ঞান সরাসরি ঈশ্বরের অস্তিত্বকে ডিনাই করে না, পৃথিবীর সবাই যদি ঈশ্বরে বিশ্বাস করতে শুরু করে তাতে বিজ্ঞানের কোন সমস্যা নেই, তবে কোন তৃতীয় পক্ষের হাত ছাড়াই একবারে শূন্য থেকে যে মহাবিশ্বের উদ্ভব হতে পারে সেটিই বিজ্ঞান প্রমান করে দেখাতে চায়। আজ থেকে প্রায় পাঁচশত কোটি বছর পূর্বে কোন একটি বিশাল নক্ষত্র ধংশ হওয়ার পর গঠিত হয় আমাদের সোলার সিস্টেম, তারপর সৃষ্টি হয় আমাদের পৃথিবী সহ আরও আটটি গ্রহ। পৃথিবী সৃষ্টির প্রায় দুইশ কোটি বছর পর প্রথম প্রাণের উৎপত্তি হয়। তারপর কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের ফলাফল হচ্ছে আজকের আমরা মানুষেরা। মানুষের জীবনের অর্থ কি এটা কেউ সঠিকভাবে বলতে পারবে না, তবে অ্যালবার্ট কাম্যুর ফিলোসফি অব এবজার্ডিটি অনুযায়ী মানুষের জীবনের আসলে কোন অর্থ নেই, তুমি যদি জীবনের অর্থ খুঁজে বেড়াও তাহলে জীবনটাকেই উপভোগ করতে পারবে না, বরং জীবনের মানে হচ্ছে তোমার নিজের মত করে এর একটি অর্থ তৈরি করা। এমনভাবে বেঁচে থাকো যেন এটি তোমার দ্বিতীয় জীবন এবং প্রথমবার যে ভুলগুলো করেছো সেগুলো আবার করতে যাচ্ছ। গুরুত্ব বুঝে সঠিক জায়গায় সময় এবং শক্তির যথাযথ ব্যবহার কর। শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে চিন্তা করেই সুস্থভাবে বেঁচে থাকা যায়। জীবনটাকে যদি একটা অনন্ত সিঁড়ি মনে কর তাহলে সেই সিঁড়ি বেয়ে চলার মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত আনন্দ।




.png)



