ওডিসি
ট্রয় নগরী তখন ধ্বংসস্তূপ। দীর্ঘ দশ বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে গ্রিক বীর এবং ইথাকার রাজা অডিসাস বুক ভরা আশা নিয়ে জাহাজে পাল তুলেছেন। উদ্দেশ্য, নিজের প্রিয় জন্মভূমি ইথাকা এবং স্ত্রী পেনেলোপির কাছে ফেরা। কিন্তু তিনি জানতেন না, তার ফেরার এই পথটুকু পাড়ি দিতে কেটে যাবে আরও দশটি দীর্ঘ বছর।
শুরুতেই তাদের জাহাজ পথ হারায়। ভাসতে ভাসতে তারা পৌঁছায় 'লোটাস-ইটার্স' বা পদ্ম-খেকোদের দেশে। সেখানকার জাদুকরী ফল খেয়ে নাবিকরা সব অতীত ভুলে সেখানেই থেকে যেতে চায়। অডিসাস জোর করে তাদের জাহাজে তুলে আবার যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু আসল বিপদ তো তখনো বাকি!
তারা এক দ্বীপে এসে আটকা পড়েন একচোখওয়ালা মানুষখেকো দৈত্য পলিফেমাসের গুহায়। দৈত্যটি গুহার মুখ বিশাল পাথর দিয়ে বন্ধ করে একের পর এক অডিসাসের সঙ্গীদের ধরে খেতে শুরু করে। অসীম সাহসী অডিসাস এক রাতে বুদ্ধি করে দৈত্যটিকে প্রচুর মদ খাইয়ে মাতাল করেন। দৈত্যটি ঘুমিয়ে পড়লে জ্বলন্ত বিশাল এক কাঠের টুকরো দিয়ে তার একমাত্র চোখটি অন্ধ করে দেন এবং সকালে ভেড়ার পালের সাথে মিশে গুহা থেকে পালিয়ে আসেন।
কিন্তু এই পলিফেমাস ছিল সমুদ্রদেবতা পসেইডনের ছেলে। নিজের ছেলের এমন অবস্থা দেখে পসেইডন রাগে ফেটে পড়েন এবং অডিসাসকে অভিশাপ দেন—তার বাড়ি ফেরার পথ হবে কণ্টকাকীর্ণ।
দেবতার অভিশাপে সাগরের বুকে শুরু হয় তাদের অন্তহীন সংগ্রাম। পথিমধ্যে এক দ্বীপে সুন্দরী ডাইনি সার্সি তার জাদুবলে অডিসাসের অর্ধেক সঙ্গীকে শূকরে পরিণত করে। অডিসাস দেবতাদের সাহায্যে সেই জাদু ভেঙে সঙ্গীদের উদ্ধার করেন। সার্সির পরামর্শে তিনি মৃতদের রাজ্য বা পাতালপুরীতে যান এবং মৃত ভবিষ্যদ্বক্তার আত্মা থেকে বাড়ি ফেরার দুর্গম উপায় জেনে নেন।
পাতালপুরী থেকে ফিরে তাদের মুখোমুখি হতে হয় আরও ভয়ংকর বিপদের। মোহনীয় সাইরেনদের মায়াবী গানের সুর নাবিকদের প্রলুব্ধ করে মৃত্যুর দিকে টেনে নিয়ে যায়। অডিসাস সঙ্গীদের কানে মোম দিয়ে এবং নিজেকে জাহাজের মাস্তুলের সাথে শক্ত করে বেঁধে সেই মৃত্যুফাঁদ পার হন। এরপর তাদের লড়তে হয় ছয় মাথার দানবী স্কিলা এবং সাগরের ভয়ংকর ঘূর্ণিজল চ্যারিবডিসের সাথে। এই ভয়াবহ লড়াইয়ে তার বেশ কয়েকজন বিশ্বস্ত সঙ্গী প্রাণ হারায়।
অবশিষ্ট সঙ্গীদের নিয়ে তিনি পৌঁছান সূর্যদেবতার দ্বীপে। কিন্তু ক্ষুধার তাড়নায় সঙ্গীরা দেবতার বারণ অমান্য করে তার পবিত্র গরু জবাই করে খেয়ে ফেলে। দেবতাদের চরম অভিশাপে সাগরের বুকে নেমে আসে প্রলয়ংকরী ঝড়। বজ্রপাতে জাহাজ টুকরো টুকরো হয়ে যায়, সাগরে ডুবে মারা যায় অডিসাসের সব সঙ্গী।
কেবলমাত্র অডিসাস একটি ভাঙা কাঠ আঁকড়ে ধরে ভাসতে ভাসতে এসে পড়েন দেবী ক্যালিপসোর দ্বীপে। ক্যালিপসো তাকে ভালোবেসে ফেলে এবং দীর্ঘ সাতটি বছর সেখানে আটকে রাখে। অবশেষে দেবরাজ জিউসের হস্তক্ষেপে ক্যালিপসো তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। অনেক বাধা পেরিয়ে অডিসাস এক দয়ালু ফিয়াসিয়ান রাজার রাজ্যে পৌঁছান। রাজা তার রোমাঞ্চকর ও করুণ কাহিনি শুনে মুগ্ধ হন এবং রাতের আঁধারে একটি গোপন জাহাজে করে তাকে ইথাকায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
দীর্ঘ কুড়ি বছর পর অডিসাস যখন নিজের রাজ্য ইথাকায় পা রাখলেন, তখন সেখানকার পরিস্থিতি ভয়াবহ। সবাই ধরে নিয়েছে রাজা মারা গেছেন। তার সুন্দরী স্ত্রী পেনেলোপিকে বিয়ে করে সিংহাসন দখলের লোভে প্রাসাদে ঘাঁটি গেড়েছে শতাধিক উদ্ধত যুবক। তারা অডিসাসের ধনসম্পদ নির্বিচারে লুটেপুটে খাচ্ছে আর পেনেলোপিকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে।
দেবী এথেনার সাহায্যে অডিসাস এক জীর্ণ বৃদ্ধ ভিখারির ছদ্মবেশ ধারণ করলেন। তিনি গোপনে তার তরুণ ছেলে টেলিমেকাস এবং বিশ্বস্ত এক ভৃত্যের সাথে দেখা করলেন। বাবা-ছেলে মিলে তৈরি করলেন প্রতিশোধের এক ভয়ংকর ছক।
এদিকে অতিষ্ঠ পেনেলোপি পাণিপ্রার্থীদের হাত থেকে বাঁচতে এক প্রতিযোগিতার আয়োজন করলেন। তিনি অডিসাসের রেখে যাওয়া বিশাল ও ভারী ধনুকটি এনে বললেন, "যে বীর এই ধনুকে জ্যা পরিয়ে বারোটি কুঠারের ছিদ্রের ভেতর দিয়ে নিখুঁতভাবে তীর ছুঁড়তে পারবে, আমি তাকেই স্বামী হিসেবে মেনে নেব।"
উদ্ধত যুবকেরা একে একে চেষ্টা করল, কিন্তু কেউ সেই ধনুক সামান্য নোয়াতেও পারল না। তখন ছদ্মবেশী বৃদ্ধ ভিখারি এগিয়ে এলেন। সবার চরম উপহাসের মাঝেই তিনি অবলীলায় ধনুকে জ্যা পরালেন এবং নিখুঁত নিশানায় তীর ছুঁড়ে অসাধ্য সাধন করলেন!
মুহূর্তের মধ্যেই ভিখারির খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এলেন ইথাকার প্রতাপশালী রাজা অডিসাস! তার চোখেমুখে তখন জ্বলন্ত আগুন। ছেলে টেলিমেকাসকে সাথে নিয়ে তিনি প্রাসাদের দরজা বন্ধ করে দিলেন এবং সেই শতাধিক লোভী যুবককে তীর ছুঁড়ে নির্মমভাবে হত্যা করে নিজের সিংহাসন পুনরুদ্ধার করলেন।
সবশেষে এলো পেনেলোপির পরীক্ষা। দীর্ঘ কুড়ি বছর পর ফিরে আসা এই মানুষটিই যে তার স্বামী, তা নিশ্চিত হতে তিনি এক কৌশল খাটালেন। দাসীকে বললেন তাদের ভারী খাটটি শোবার ঘর থেকে বাইরে এনে বিছানা করে দিতে। অডিসাস সাথে সাথে রেগে গিয়ে বললেন, "এটা তো অসম্ভব! ওই খাট আমি একটি জীবন্ত জলপাই গাছের গুঁড়ি কেটে বানিয়েছিলাম, যার শিকড় এখনো মাটিতে গেড়ে আছে। গাছ না কাটলে ওটা সরানো কারো পক্ষে সম্ভব নয়!"
এই গোপন কথাটি কেবল পেনেলোপি আর অডিসাস জানতেন। পেনেলোপির আর কোনো সন্দেহ রইল না। তিনি ছুটে গিয়ে স্বামীকে জড়িয়ে ধরলেন। দীর্ঘ কুড়ি বছরের প্রতীক্ষা, কান্না আর অমানসিক কষ্টের পর ইথাকার রাজা ও রানীর এই আবেগঘন পুনর্মিলনের মধ্য দিয়েই সমাপ্তি ঘটল বীর অডিসাসের মহাকাব্যিক যাত্রার।
