অ্যান্টিফ্রেজাইল: অস্থির ও অনিশ্চিত সময়ে ব্যবসার টিকে থাকার এবং উন্নতি করার কৌশল
বর্তমান বিশ্বের ব্যবসার পরিবেশ অত্যন্ত অস্থির। মহামারী, অর্থনৈতিক মন্দা, প্রযুক্তিগত দ্রুত পরিবর্তন বা রাজনৈতিক অস্থিরতা, যেকোনো সময় যেকোনো কিছু ঘটে যেতে পারে। একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আপনি কি এই ধাক্কাগুলো সামলাতে প্রস্তুত? নাকি একটি বড় ধাক্কাই আপনার সাজানো ব্যবসা তছনছ করে দিতে পারে?
বিখ্যাত চিন্তাবিদ ও প্রাক্তন অপশন ট্রেডার নাসিম নিকোলাস তালেব তাঁর যুগান্তকারী বই 'Antifragile: Things That Gain from Disorder' বইটিতে এই অনিশ্চয়তাকে মোকাবেলা করার এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। এটি কেবল টিকে থাকার কৌশল নয়, বরং বিশৃঙ্খলাকে ব্যবহার করে আরও শক্তিশালী হওয়ার কৌশল।
আজকের লেখায় আমরা আলোচনা করব এই বইয়ের মূল ধারণা এবং ব্যবসায়ীদের জন্য এর থেকে প্রাপ্ত ৬টি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিয়ে।
অ্যান্টিফ্রেজালিটি কী?
তালেব যুক্তি দেন যে আমরা সাধারণত পৃথিবীকে দুটি ভাগে দেখি: ভঙ্গুর এবং মজবুত। কিন্তু এর বাইরেও একটি তৃতীয় অবস্থা আছে, যার নাম তিনি দিয়েছেন অ্যান্টিফ্রেজাইল। চলুন এই তিনটি অবস্থার পার্থক্য বুঝে নিই:
১. ভঙ্গুর: যা আঘাত পেলে ভেঙে যায়।
যেমন: একটি কাচের গ্লাস। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে, যে কোম্পানির প্রচুর ঋণ আছে এবং মাত্র একজন বড় ক্লায়েন্টের ওপর নির্ভরশীল, তারা ভঙ্গুর। একটি ছোট অর্থনৈতিক ধাক্কাই তাদের শেষ করে দিতে পারে। এরা স্থিতি এবং নিশ্চয়তা পছন্দ করে।
২. মজবুত বা স্থিতিস্থাপক: যা আঘাত সহ্য করতে পারে এবং আগের অবস্থায় ফিরে আসে, কিন্তু এতে তার কোনো উন্নতি হয় না।
যেমন: একটি পাথর। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে, একটি কোম্পানি যার অনেক নগদ অর্থ আছে কিন্তু তারা নতুন কোনো উদ্ভাবন করে না। তারা সংকট পার করতে পারে, কিন্তু এর থেকে লাভবান হয় না।
৩. অ্যান্টিফ্রেজাইল: এটি ভঙ্গুরের সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি এমন কিছু যা আঘাত, বিশৃঙ্খলা বা অস্থিরতার মুখোমুখি হলে কেবল টিকেই থাকে না, বরং আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হয়।
যেমন: গ্রিক মিথলজিতে হাইড্রা নামের দানব, যার একটি মাথা কাটলে দুটি নতুন মাথা গজায়। অথবা মানুষের পেশী, যা ভারোত্তোলনের চাপের ফলে ছিঁড়ে গিয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে পুনর্গঠিত হয়।
একজন ব্যবসায়ীর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত তার প্রতিষ্ঠানকে কেবল মজবুত নয়, বরং অ্যান্টিফ্রেজাইল হিসেবে গড়ে তোলা, যাতে বাজারের অস্থিরতা তাদের উন্নতির কারণ হয়।
ব্যবসায়ীদের জন্য অ্যান্টিফ্রেজাইল থেকে ৬টি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
তালেবের এই দর্শন কীভাবে আপনি আপনার ব্যবসায় প্রয়োগ করবেন? নিচে তার ৬টি বাস্তবসম্মত উপায় আলোচনা করা হলো:
১. বারবেল কৌশল: ঝুঁকির দ্বিমুখী নীতি এডপ্ট করুন
তালেব মাঝারি ঝুঁকি নেওয়ার ঘোর বিরোধী। কারণ মাঝারি ঝুঁকিগুলো অনেক সময় বড় বিপদের মুখোশ পরে থাকে। এর পরিবর্তে তিনি বারবেল কৌশল ব্যবহারের পরামর্শ দেন। যেমন একটি বারবেলের দুই প্রান্তে ওজন থাকে এবং মাঝখানটা খালি থাকে, তেমনি আপনার বিনিয়োগ কৌশলও হওয়া উচিত দ্বিমুখী:
এক প্রান্ত (অত্যন্ত নিরাপদ): আপনার ব্যবসার মূল সম্পদ বা ক্যাপিটালের একটি বড় অংশ (ধরুন ৮০-৯০%) অত্যন্ত নিরাপদ এবং তরল অবস্থায় রাখুন। এটি আপনাকে যেকোনো বড় সংকটে টিকে থাকতে সাহায্য করবে।
অন্য প্রান্ত (অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ): বাকি ছোট অংশটি (১০-২০%) খুব উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু উচ্চ সম্ভাবনাময় নতুন প্রকল্পে ব্যবহার করুন, যেমন: নতুন প্রোডাক্ট লাইন বা স্টার্টআপে বিনিয়োগ।
যদি ওই ঝুঁকিপূর্ণ প্রজেক্ট ব্যর্থ হয়, আপনার ক্ষতি সীমিত (মাত্র ১০-২০%)। কিন্তু যদি সফল হয়, তবে লাভের সম্ভাবনা অসীম। সুতরাং পুরো ব্যবসাকে কখনোই মাঝারি ঝুঁকিতে ফেলবেন না।
২. অতিরিক্ত দক্ষতার বিপদ ও বাফারের গুরুত্ব
আধুনিক এমবিএ শিক্ষায় সবসময় অপ্টিমাইজেশন বা সর্বোচ্চ দক্ষতার কথা বলা হয়।
যেমন: খরচ কমাতে 'জাস্ট-ইন-টাইম' সাপ্লাই চেইন ব্যবহার করা, যাতে কোনো অতিরিক্ত ইনভেন্টরি বা স্টক না থাকে। তালেব বলেন, এটি ব্যবসাকে চরম ভঙ্গুর করে তোলে।
যদি আপনার কোনো অতিরিক্ত স্টক না থাকে এবং হঠাৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটে (যেমনটি কোভিডের সময় হয়েছিল), আপনার পুরো উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে।
ব্যবসায় কিছুটা অতিরিক্ত থাকা অপচয় নয়, এটি হলো ইনস্যুরেন্সের মত। অতিরিক্ত নগদ অর্থ, অতিরিক্ত ইনভেন্টরি বা একাধিক সরবরাহকারী হাতে রাখা আপনাকে সংকটের সময় প্রতিযোগীদের চেয়ে এগিয়ে রাখবে।
৩. ছোট ছোট ভুলের মাধ্যমে শেখা
বড় বড় কর্পোরেট অফিসে বসে তৈরি করা নিখুঁত ৫ বছরের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রায়শই বাস্তবে ব্যর্থ হয়। তালেব বলেন, অ্যান্টিফ্রেজাইল সিস্টেম তাত্ত্বিক পরিকল্পনার চেয়ে 'ট্রায়াল অ্যান্ড এরর' বা ভুল থেকে শেখার মাধ্যমে বেশি উন্নতি করে।
নতুন কিছু শুরু করার জন্য বিশাল পরিকল্পনার অপেক্ষা করবেন না। ছোট আকারে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করুন। দ্রুত ব্যর্থ হোন, অল্প ক্ষতিতে শিক্ষা নিন এবং সেই শিক্ষা কাজে লাগিয়ে আবার চেষ্টা করুন। ছোট ছোট ভুলগুলোই আপনাকে বড় বিপর্যয় থেকে বাঁচাবে এবং উদ্ভাবনের পথ দেখাবে।
৪. বিকল্প পথ খোলা রাখা
ব্যবসায় ভঙ্গুরতা আসে বাধ্যবাধকতা থেকে। যেমন: দীর্ঘমেয়াদী কঠিন লিজ চুক্তি, বিশাল ব্যাংক ঋণ, বা একটি মাত্র প্রযুক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা। অ্যান্টিফ্রেজালিটি আসে অপশন বা বিকল্প হাতে থাকা থেকে।
নিজেকে এমন অবস্থানে রাখুন যেখানে আপনার কাছে বিকল্প পথ খোলা থাকে। এমন চুক্তি করুন যা থেকে প্রয়োজনে সহজে বের হওয়া যায়। ঋণ এড়িয়ে চলুন, কারণ ঋণ আপনাকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট আয় করতে বাধ্য করে। যখন আপনার হাতে বিকল্প থাকে, তখন বাজারের পরিবর্তন আপনাকে বাধ্য করে না, বরং আপনাকে নতুন সুযোগ দেয়।
৫. বিয়োজনের মাধ্যমে উন্নয়ন
অনেক সিইও মনে করেন, সমস্যা সমাধানের জন্য নতুন কিছু যোগ করতে হবে, নতুন বিভাগ, নতুন নিয়ম, নতুন সফটওয়্যার। তালেব একে বলেন 'Naive Interventionism'। তিনি 'ভিয়া নেগেটিভা' বা বিয়োজনের মাধ্যমে উন্নতির পরামর্শ দেন।
নতুন কিছু শুরু করার আগে ভাবুন কী কী বাদ দেওয়া যায়। আপনার ব্যবসার কোন ক্লায়েন্টগুলো সবচেয়ে বেশি সময় নষ্ট করে কিন্তু প্রফিট কম দেয়? তাদের বাদ দিন। কোন প্রক্রিয়াগুলো অহেতুক জটিল? সেগুলো সরল করুন। জটিলতা কমালে বড় ভুলের সম্ভাবনা কমে যায় এবং ব্যবসা আরও মজবুত হয়।
৬. স্কিন ইন দ্য গেম
এটি তালেবের পরবর্তী বইয়ের মূল বিষয়, কিন্তু অ্যান্টিফ্রেজালিটির জন্যও এটি অপরিহার্য। একটি ব্যবসা তখনই ভঙ্গুর হয়ে পড়ে যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা তাদের ভুল সিদ্ধান্তের জন্য ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।
যেমন: একজন বেতনভুক্ত সিইও ঝুঁকি নিয়ে কোম্পানি ডুবিয়ে দিয়েও নিজের বিশাল বোনাস নিয়ে সরে পড়তে পারেন।
নিশ্চিত করুন যে আপনার এবং আপনার মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের 'স্কিন ইন দ্য গেম' আছে। অর্থাৎ, ব্যবসার লাভ হলে যেমন তারা লাভবান হবে, ক্ষতি হলেও যেন তাদের সেই ক্ষতির ভাগীদার হতে হয়। এটি দায়িত্বজ্ঞানহীন জুয়া খেলা বন্ধ করে এবং দীর্ঘমেয়াদী টেকসই সিদ্ধান্তের দিকে ধাবিত করে।
শেষ কথা
অ্যান্টিফ্রেজাইল কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক মডেল নয়, এটি একটি মাইন্ডসেট। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত এবং আমরা তা নিখুঁতভাবে অনুমান করতে পারি না, এই সত্যটি মেনে নেওয়াই এর ভিত্তি।
