বিশৃঙ্খলার প্রতিষেধক: একটি অর্থপূর্ণ জীবনের সন্ধানে

Antidote to chaos

জীবন সহজ নয়। এটি একটি অনিবার্য সত্য। আমাদের অস্তিত্বের প্রতিটি মুহূর্তে আমরা এক অদৃশ্য যুদ্ধের মুখোমুখি হই, শৃঙ্খলা এবং বিশৃঙ্খলার মধ্যকার যুদ্ধ। আমরা নিরাপত্তা চাই, নিশ্চিত ভবিষ্যৎ চাই, কিন্তু জীবন বারবার আমাদের অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ছুঁড়ে ফেলে। দুঃখ, হতাশা এবং ব্যর্থতা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তাহলে এই যন্ত্রণাপূর্ণ পৃথিবীতে আমরা কীভাবে টিকে থাকব? কীভাবে কেবল বেঁচে না থেকে, একটি ভালো জীবন যাপন করব?

বিখ্যাত ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট জর্ডান পিটারসন তার যুগান্তকারী বই 'টুয়েলভ রুলস ফর লাইফ' বইটিতে এর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তার মতে, জীবনের উদ্দেশ্য সুখ খোঁজা নয়, বরং জীবনের উদ্দেশ্য হলো অর্থ খুঁজে পাওয়া। আর এই অর্থ খুঁজে পাওয়ার একমাত্র পথ হলো স্বেচ্ছায় দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া।

পিটারসনের এই ১২টি রুলস কেবল কিছু উপদেশ নয়, এগুলো হলো গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্য, যা আমাদের নিজেদের দুর্বলতার মুখোমুখি দাঁড় করায় এবং আমাদের ভেতরের সুপ্ত সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করে। আসুন, এই নিয়মগুলোর গভীরে প্রবেশ করি।

১. মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ান 

এটি কেবল শারীরিক ভঙ্গির উপদেশ নয়, এটি আপনার অস্তিত্বের একটি ডিক্লারেশন। যখন আমরা জীবনের ভারে নুইয়ে পড়ি, আমাদের শরীরও কুঁকড়ে যায়। পিটারসন লবস্টারের উদাহরণ দিয়ে বোঝান যে, প্রকৃতির রাজ্যেও শক্তিশালী ভঙ্গি বিজয়ের প্রতীক এবং এটি আমাদের মস্তিষ্কে সেরোটোনিন নিঃসরণ বাড়ায়, যাতে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। আপনি যদি রাজার মত বাঁচতে চান, তাহলে রাজার মত আচরণ করুন। 

সোজা হয়ে দাঁড়ানো মানে হলো জীবনের চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকা। এটি নিজেকে এবং পৃথিবীকে বার্তা দেওয়া যে, আমি এখানে আছি, আমি সক্ষম, এবং আমি আমার অস্তিত্বের ভার বহন করতে প্রস্তুত। এটি স্বেচ্ছায় জীবনের দুঃখ কষ্টকে বরণ করে নেওয়ার প্রথম ধাপ।

২. নিজের যত্ন নিন, যেভাবে আপনি আপনার পোষা প্রাণী বা প্রিয়জনের যত্ন নেন 

আমরা প্রায়শই নিজেদের সবচেয়ে বড় শত্রু। আমরা আমাদের পোষা বিড়ালকে সময়মতো ওষুধ খাওয়াই, কিন্তু নিজেদের ডাক্তারের কাছে যেতে অবহেলা করি। আমরা নিজেদের প্রতি নিষ্ঠুর।

আপনার নিজের প্রতি একটি নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। আপনার ভেতরে এমন কিছু আছে যা পৃথিবীর প্রয়োজন। নিজেকে অবজ্ঞা করা মানে সেই সম্ভাবনাকে হত্যা করা। নিজেকে সম্মান করুন। আপনার নিজের ভালো অভিভাবক হয়ে উঠুন। নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন, আমার জীবনকে একটু ভালো করার জন্য আজ আমি নিজের জন্য কী করতে পারি?

৩. তাদের সাথেই বন্ধুত্ব করুন যারা আপনার সেরাটা চায় 

আপনার চারপাশের মানুষ আপনার ভাগ্য নির্ধারনে গুরুত্বপূর্ন প্রভাব ফেলে। যারা আপনাকে নিচে টেনে নামায়, আপনার খারাপ অভ্যাসগুলোকে সমর্থন করে, তারা বন্ধু নয়, তারা আপনাকে ধ্বংস করতে চায়।

টক্সিক রিলেশন থেকে বের হওয়া খুব কঠিন, কারণ এর জন্য সাহসের প্রয়োজন। আপনাকে এমন মানুষদের বেছে নিতে হবে যারা আপনার উন্নতি দেখে খুশি হয়, ঈর্ষান্বিত নয়। যারা আপনার ভুল ধরিয়ে দেয় কিন্তু আপনাকে ছোট করে না। সুস্থ সঙ্গ নির্বাচন করা স্বার্থপরতা নয়, বরং এটি আপনার আত্মরক্ষা এবং উন্নতির জন্য অপরিহার্য।

৪. আজকের অন্য কারো সাথে নয়, গতকালের নিজের সাথে নিজের তুলনা করুন 

সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে আমরা সবসময় অন্যের সাফল্যের চূড়ান্ত মুহূর্তগুলো দেখি এবং হতাশ হই। এই তুলনা বিষাক্ত এবং অর্থহীন।

প্রত্যেকের জীবনের যাত্রা ভিন্ন। আপনার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন আপনি নিজে। গতকাল আপনি যা ছিলেন, আজ তার চেয়ে একটু ভালো হওয়ার চেষ্টা করুন। এই ছোট ছোট উন্নতিগুলোই দীর্ঘমোদে বিশাল পরিবর্তন আনে। অন্যের দিকে তাকিয়ে ঈর্ষা না করে, নিজের যাত্রার দিকে মনোনিবেশ করুন।

৫. আপনার সন্তানদের এমন কিছু করতে দেবেন না যাতে আপনি তাদের অপছন্দ করতে শুরু করেন 

এই উপদেশটি যারা বাবা-মা হয়েছেন তাদের জন্য। অনেক আধুনিক বাবা-মা তাদের সন্তানদের শাসন করতে ভয় পান। কিন্তু পিটারসন বলেন, যদি কোনো শিশুর আচরণে তার নিজের বাবা-মা বিরক্ত হন, তবে বাইরের পৃথিবী তাকে আরও কঠোরভাবে বিচার করবে।

অভিভাবক হিসেবে আপনার দায়িত্ব হলো সন্তানকে সমাজের উপযোগী করে গড়ে তোলা। তাদের সঠিক আচরণ শেখানো, সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া। এটি তাদের প্রতি ভালোবাসা, নিষ্ঠুরতা নয়। একটি সুশৃঙ্খল শিশু ভবিষ্যতে একজন আত্মবিশ্বাসী এবং জনপ্রিয় প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠে।

৬. বিশ্বকে সমালোচনা করার আগে নিজের ঘর পুরোপুরি সাজান 

পৃথিবীর সমস্যা নিয়ে অভিযোগ করা সহজ। সরকার খারাপ, সমাজ নষ্ট, এসব বলা খুব আরামদায়ক কারণ এতে নিজের কোনো দায়িত্ব থাকে না।

আগে আয়নায় নিজের দিকে তাকান। আপনার নিজের জীবনে কি বিশৃঙ্খলা নেই? আপনার সম্পর্কগুলো কি ঠিক আছে? আপনি কি আপনার সেরাটা দিচ্ছেন? যতক্ষণ না আপনি নিজের ক্ষুদ্র পরিসরের বিশৃঙ্খলা দূর করতে পারছেন, ততক্ষণ বৃহৎ পৃথিবীর সমালোচনা করার কোনো নৈতিক অধিকার আপনার নেই। পরিবর্তন নিজের ঘর থেকেই শুরু হয়।

৭. যা অর্থপূর্ণ তার পেছনে ছুটুন, যা সুবিধাজনক তার পেছনে নয়

সুবিধাজনক হলো তাৎক্ষণিক সুখ, যা সহজ এবং এখনই পাওয়া যায়, যেমন: ঘন্টার পর ঘন্টা ফোন স্ক্রল করা। অর্থপূর্ণ হলো তা, যা কঠিন কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মূল্যবান, যেমন: নতুন কিছু শেখা, বা কারো উপকারে আসা।

জীবনের গভীরতম সন্তুষ্টি আসে ত্যাগের মাধ্যমে। ভবিষ্যতের ভালোর জন্য বর্তমানের সুখ ত্যাগ করার ক্ষমতা আমাদের মানুষ হিসেবে অনন্য করে তোলে। দায়িত্ব গ্রহণ এবং ত্যাগের মাধ্যমেই জীবনের প্রকৃত অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়। সহজ পথ আপনাকে গন্তব্যে নিয়ে যাবে না।

৮. সত্য বলুন, অন্তত মিথ্যা বলবেন না 

আমরা ছোট ছোট মিথ্যা বলে নিজেদের এবং অন্যকে বাঁচাতে চাই। কিন্তু প্রতিটি মিথ্যা বাস্তবতাকে বিকৃত করে। মিথ্যা বলে আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করতে শুরু করি যা আমাদের কল্পনায় তৈরি, যা শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়বেই।

সত্য কঠিন, সত্য বেদনাদায়ক, কিন্তু সত্যই মুক্তি দেয়। আপনি যখন সত্য বলেন, তখন আপনি বাস্তবতার শক্ত জমিনে দাঁড়িয়ে থাকেন। মিথ্যা আপনাকে দুর্বল করে এবং আপনার আত্মাকে কলুষিত করে। সত্যবাদিতা হলো বিশৃঙ্খলা থেকে শৃঙ্খলায় ফেরার পথ।

৯. ধরে নিন আপনি যার কথা শুনছেন, তিনি এমন কিছু জানেন যা আপনি জানেন না 

বেশিরভাগ সময় আমরা অন্যের কথা শুনি না, শুধু নিজের বলার সুযোগের অপেক্ষা করি। এটি অহংকার।

সত্যিকারের শোনা হলো একটি দুঃসাহসিক অভিযান। যখন আপনি বিনয়ের সাথে কারো কথা শোনেন, তখন আপনি আপনার নিজের ভুল ধারণাগুলো ভাঙার সুযোগ পান। আপনি নতুন কিছু শিখতে পারেন যা আপনার জীবনকে বদলে দিতে পারে। আপনার জ্ঞান সীমিত, নিজেকে সবসময় মনে করিয়ে দিন যে আপনি এই পৃথিবী এবং মহাবিশ্ব সম্পর্কে কত কম জানেন, এই বোধ আপনাকে জ্ঞানী করে তুলবে।

১০. কথা বলার সময় সুনির্দিষ্ট হোন 

যখন আমাদের জীবনে সমস্যা আসে, আমরা প্রায়শই সেগুলোকে অস্পষ্ট রাখি। "আমার জীবন খারাপ যাচ্ছে" এটি একটি বিশাল, ভীতিকর দৈত্যের মতো।

আপনার সমস্যা ঠিক কী? আপনার ভয় ঠিক কী নিয়ে? যখন আপনি কোনো সমস্যাকে সুনির্দিষ্ট ভাষায় প্রকাশ করেন, তখন সেটি আর অদম্য দৈত্য থাকে না; সেটি একটি নির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জে পরিণত হয় যার সমাধান সম্ভব। অস্পষ্টতা উদ্বেগের জন্ম দেয়, আর সুনির্দিষ্টতা কর্মের পথ দেখায়।

১১. বাচ্চারা যখন স্কেটবোর্ডিং করে, তখন তাদের বিরক্ত করবেন না 

এটি একটি রূপক বা মেটাফোরিক উপদেশ। আমরা আমাদের প্রিয়জনদের, বিশেষ করে শিশুদের, সমস্ত বিপদ থেকে রক্ষা করতে চাই। কিন্তু অতিরিক্ত সুরক্ষা তাদের দুর্বল করে দেয়। যে সকল বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের কস্ট করতে দেয় না সে সন্তানেরা জীবনে বড় হয়ে বাইরের দুনিয়ার সাথে খাপ খাইয়ে চলতে পারে না।

মানুষকে ঝুঁকি নিতে দিন। পড়ে গিয়ে ব্যথা পেতে দিন। স্কেটবোর্ডিংয়ের মতো রিস্কি খেলাধুলা তাদের ভয়কে জয় করতে এবং নিজের ক্ষমতার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে শেখায়। বিপদ এবং ঝুঁকির মাধ্যমেই মানুষ সহনশীল এবং শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তাদের নিরাপদ রাখতে গিয়ে তাদের অক্ষম করে তুলবেন না।

১২. রাস্তায় কোনো বিড়ালের দেখা পেলে তাকে আদর করুন 

জীবনের সমস্ত দুঃখকষ্ট এবং দায়িত্বের ভারের মধ্যেও কিছু ছোট ছোট সুন্দর মুহূর্ত থাকে। একটি বিড়ালের সাথে খেলা, এক কাপ ভালো কফি, বা সূর্যাস্তের সৌন্দর্য।

যখন জীবন অসহনীয় মনে হয়, তখন ভবিষ্যতের চিন্তা বাদ দিন। বর্তমান মুহূর্তের ক্ষুদ্র আনন্দগুলোতে মনোযোগ দিন। এই ছোট ছোট কৃতজ্ঞতার মুহূর্তগুলোই আমাদের দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকারের মধ্যে আলো দেখায় এবং এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়।

শেষ কথা

জর্ডান পিটারসনের এই ১২টি রুলস আমাদের সুখের নিশ্চয়তা দেয় না, কিন্তু এগুলো আমাদের মেরুদণ্ড শক্ত করতে সাহায্য করে। এগুলো আমাদের শেখায় যে জীবনের বিশৃঙ্খলাকে ভয় না পেয়ে, দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে তার মুখোমুখি হওয়াই হলো প্রকৃত মানুষের কাজ। যখন আমরা স্বেচ্ছায় আমাদের বোঝা বহন করি, তখনই আমরা জীবনের গভীরতর অর্থ খুঁজে পাই। আর এই অর্থপূর্ণ জীবনই হলো বিশৃঙ্খলার প্রকৃত প্রতিষেধক।

আজই শুরু করুন। সোজা হয়ে দাঁড়ান এবং আপনার জীবনের দায়িত্ব নিন।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url