ফিলিস্তিন এবং ইসরায়েলের মধ্যে সংকটের মূল কারণ ও ভবিষ্যৎ

Gaza

বিশ্বের যে সংঘাতগুলো খবরের শিরোনামে বার বার ফিরে আসে, তার মধ্যে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকট সবচেয়ে জটিল এবং দীর্ঘস্থায়ী। এটি কেবল দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে সাম্প্রতিক কোনো বিবাদ নয়, বরং এর পেছনে জড়িয়ে আছে কয়েক দশকের ইতিহাস, ধর্ম, রাজনীতি এবং ভূমি ও পরিচয়ের গভীর দ্বন্দ্ব।

এই সংঘাতকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে, আমাদের প্রথমে এর মূল কারণগুলো খতিয়ে দেখতে হবে এবং তারপর সমাধানের সম্ভাব্য পথগুলো নিয়ে ভাবতে হবে।

সংকটের শেকড়: কেন এই সংঘাত?

ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতকে প্রায়শই একটিমাত্র কারণে সীমিত করা হয়, কিন্তু সত্য হলো এটি বহুস্তরীয় একটি সমস্যা। এর মূল কারণগুলোকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যেতে পারে:

১. বর্তমানে অমীমাংসিত বিষয়সমূহ

এই বিষয়গুলোই হলো শান্তি আলোচনার প্রধান বাধা এবং সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু:

ভূমি ও সীমান্ত: ফিলিস্তিনিরা চায় ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের আগের সীমানা অনুযায়ী পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা এবং পূর্ব জেরুজালেম নিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। ইসরায়েল নিরাপত্তার কারণ এবং ঐতিহাসিক দাবির ভিত্তিতে এই সীমানা মানতে নারাজ।

জেরুজালেম: এই শহরটি মুসলিম, ইহুদি এবং খ্রিস্টান, তিনটি প্রধান ধর্মের কাছেই পবিত্র। ইসরায়েল পুরো শহরটিকে তাদের "অবিচ্ছেদ্য রাজধানী" মনে করে। ফিলিস্তিনিরা পূর্ব জেরুজালেমকে তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে চায়।

ইহুদি বসতি: ১৯৬৭ সালের পর দখল করা ফিলিস্তিনি ভূমি, বিশেষ করে পশ্চিম তীরে, ইসরায়েল অসংখ্য ইহুদি বসতি নির্মাণ করেছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এগুলো অবৈধ এবং একটি কার্যকর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পথে এগুলোকে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখা হয়।

ফিলিস্তিনি শরণার্থী: ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের সময় লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়। এই শরণার্থীরা ও তাদের বংশধরেরা তাদের ভিটেমাটিতে ফিরে যাওয়ার অধিকার দাবি করে। ইসরায়েল এর বিরোধিতা করে, কারণ এটি তাদের রাষ্ট্রের ইহুদি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য হুমকি হতে পারে বলে তারা মনে করে।

নিরাপত্তা: ইসরায়েল নিজেদের নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং হামাসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর রকেট হামলা থেকে সুরক্ষা চায়। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলি সামরিক দখলদারিত্বের অবসান এবং নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা দাবি করে।

২. ঐতিহাসিক পটভূমি 

আজকের এই পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে:

ব্রিটিশ ম্যান্ডেট (১৯২০-১৯৪৮): উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর ফিলিস্তিন অঞ্চল ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে আসে। এই সময়ে ইউরোপে ইহুদি-বিদ্বেষ বাড়তে থাকলে, ইহুদিদের ফিলিস্তিনে অভিবাসন বাড়ে, যা জায়নবাদী আন্দোলন নামে পরিচিত।

১৯৪৮ সালের যুদ্ধ (নাকবা): জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে বিভক্ত করার পরিকল্পনা করলেও আরব দেশগুলো তা প্রত্যাখ্যান করে। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষণার পরপরই আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে ইসরায়েল জয়ী হয় এবং সাড়ে সাত লক্ষ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়, যা ফিলিস্তিনিদের কাছে "নাকবা" বা "মহাবিপর্যয়" নামে পরিচিত।

১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধ: এই যুদ্ধে ইসরায়েল মিশর, সিরিয়া ও জর্ডানকে পরাজিত করে পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা, পূর্ব জেরুজালেম এবং গোলান মালভূমি দখল করে নেয়। এই "সামরিক দখলদারিত্ব" বর্তমান সংঘাতের মূল ভিত্তি।

সমাধানের খোঁজে: ভবিষ্যৎ কোন পথে?

কয়েক দশক ধরে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সমাধানের জন্য বিভিন্ন প্রস্তাব আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি পথই জটিল এবং চ্যালেঞ্জে পূর্ণ। প্রধানত তিনটি সম্ভাব্য পরিণতির কথা ভাবা হয়:

১. দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান 

এটিই আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে সমর্থিত সমাধান।

মূল ধারণা: ইসরায়েল রাষ্ট্রের পাশাপাশি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে। এই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র পশ্চিম তীর ও গাজা নিয়ে গঠিত হবে এবং পূর্ব জেরুজালেম তার রাজধানী হবে।

বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ: এই সমাধান বাস্তবায়নের পথ এখন প্রায় রুদ্ধ। প্রধান কারণ হলো পশ্চিম তীরে নির্মিত অসংখ্য ইসরায়েলি বসতি, যা একটি সংলগ্ন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনকে প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে।

২. এক-রাষ্ট্র সমাধান 

দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান অবাস্তব হয়ে ওঠায় এই বিকল্পটি নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। এর দুটি রূপ রয়েছে:

ক) গণতান্ত্রিক এক-রাষ্ট্র: জর্ডান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত একটিমাত্র রাষ্ট্র গঠিত হবে, যেখানে ইহুদি এবং ফিলিস্তিনি আরবরা সবাই সমান নাগরিক অধিকার নিয়ে বাস করবে।

চ্যালেঞ্জ: এই সমাধান ইসরায়েলের "ইহুদি রাষ্ট্র" হিসেবে পরিচয়ের মূল ধারণাকে বাতিল করে দেয়। জনসংখ্যাতাত্ত্বিক কারণে ইহুদিরা সংখ্যালঘু হয়ে পড়তে পারে, যা বেশিরভাগ ইসরায়েলি গ্রহণ করতে নারাজ।

খ) বৈষম্যমূলক এক-রাষ্ট্র (বাস্তব পরিস্থিতি): অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এটিই এখন কার্যত ঘটছে। যেখানে ইসরায়েল পুরো অঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে, কিন্তু ফিলিস্তিনিদের পূর্ণ নাগরিক অধিকার দেয় না। সমালোচকরা এই ব্যবস্থাকে "বর্ণবাদ" হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

৩. চলমান অচলাবস্থা

এটি কোনো সমাধান নয়, বরং একটি হতাশাজনক পরিণতি, যা বর্তমানে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত মনে হচ্ছে।

এর অর্থ: কোনো স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান না হওয়া। ইসরায়েলি দখলদারিত্ব ও গাজার অবরোধ চলতে থাকা, বসতি নির্মাণ বৃদ্ধি পাওয়া এবং এর প্রতিক্রিয়ায় ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ ও সংঘাতের চক্র চলতেই থাকা। এটি কেবল আরও অস্থিতিশীলতা এবং মানবিক বিপর্যয়ের জন্ম দেয়।

শেষ কথা

ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকটের কোনো সহজ বা দ্রুত সমাধান নেই। কয়েক দশকের অবিশ্বাস, রক্তপাত এবং গভীর ক্ষতের ওপর দাঁড়িয়ে শান্তি স্থাপন প্রায় অসম্ভব বলে মনে হতে পারে।

একটি স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন হবে উভয় পক্ষের নেতৃত্বের কাছ থেকে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বেদনাদায়ক ছাড় দেওয়ার মানসিকতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী মধ্যস্থতা। যতদিন পর্যন্ত ভূমি, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মর্যাদার মূল প্রশ্নগুলোর সমাধান না হচ্ছে, ততদিন এই শতাব্দীর প্রাচীনতম সংঘাতটির শান্তিপূর্ণ সমাপ্তি হয়তো একটি দূরবর্তী স্বপ্নই থেকে যাবে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url