মানুষের জিবনের অর্থ কি?
এখন একেক জাতী গোষ্ঠী একেক সময়ে একেক রকম ধর্ম উদ্ভাবন করেছে। কোন জাতীর ধর্ম অনেক আপডেট, আবার কোন জাতীর ধর্ম অনেক পুরনো হয়ে গিয়েছে। এছাড়াও প্রতিনিয়ত পৃথিবীতে নতুন নতুন ধর্মের উদ্ভব হচ্ছে। সেসব ধর্ম মানুষের মৌলিক প্রশ্নগুলোর সন্তোষমূলক উত্তর দিতে পারে সেই ধর্মগুলো এখনো টিকে রয়েছে। বাকিগুলো বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে।
মানুষ নিজে টিকে থাকার প্রয়োজনে ধর্ম সৃষ্টি করেছে আবার মানুষই ধর্মকে হারিয়ে যেতে দিয়েছে। পৃথিবীতে অনেক ধর্ম ছিল যেসব ধর্মের এখন আর একজন অনুসারীয়ও অবশিষ্ট নেই। সেই ধর্মের অস্থিত্বও পৃথিবীতে আর নেই। থাকবে কিভাবে যদি কোন অনুসারী না থাকে।
এখন এতএত ধর্মের মধ্যে তুমি কিভাবে বুঝবে কোনটি সত্য ধর্ম। মজার বিষয় হচ্ছে প্রত্যেক ধর্মই দাবী করে এক মাত্র সেটিই সত্য ধর্ম আর বাকি সব মিথ্যা। সে যাইহোক, তুমি যদি তোমার ধর্মে জিবনের অর্থ খুঁজে পাও, শান্তি খুঁজে পাও, তাহলে এটিই তোমার জন্যে যথেষ্ট। তুমি শুধু তোমার নিজস্ব ধর্ম পালন করেই তোমার মত করে জীবন কাটিয়ে দিতে পারো। অন্যের ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করার কোন প্রয়োজন নেই। ধর্মের নামে কাউকে অন্যের শান্তি নষ্ট করার অধিকার দেওয়া হয়নি। পৃথিবীতে সবাই একই অধিকার নিয়ে এসেছে আর সেটি হচ্ছে সুখে শান্তিতে বসবাস করার অধিকার।
তবে কেউ কেউ আছে যাদের জ্ঞান শুধুমাত্র ধর্মীয় সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়। তারা প্রচলিত বিশ্বাসে বিশ্বাসী নয়। আমি কোন আধুনিক বিজ্ঞানীকে দেখিনাই কোন প্রতিষ্ঠিত ধর্মে বিশ্বাস করতে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো আস্তিক হতে পারে তবে তারা কখনো কোন ধর্মীয় নিয়ম কানুন অনুসরণ করে চলে না। তাদের চিন্তার কাঠামো হচ্ছে বিজ্ঞান এবং যুক্তি নির্ভর। স্টিফেন হকিংকে যখন তার হবু বউ যেন জিজ্ঞেস করেছিল তুমি ধর্মে বিশ্বাস কর কিনা, তখন স্টিফেন জবাবে বলেছিল সে কসমোলজিতে বিশ্বাসী। মানে মহাকাশবিজ্ঞান।
বিগব্যাং তত্ত্ব অনুযায়ী মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে শূন্য থেকে। তারপর বিলিয়ন বিলয়ন বছর ধরে সৃষ্টি হয়েছে মহাবিশ্বের বিভিন্ন স্থানে নীহারিকা, গ্যাল্যাক্সি, নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহ ইত্যাদি। বিশাল এই মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র একটি গ্যালাক্সির ক্ষুদ্র একটি সৌরজগতের একটি গ্রহ আমাদের এই নীল পৃথিবী। প্রাণের উৎপত্তি বিষয়ক হাইপোথিসিস অনুযায়ী পৃথিবী সৃষ্টির প্রায় দুইশ কোটি বছর পর পানি থেকেই প্রথম পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব হয়। প্রথমে একটি এক কোষী প্রাণী এমিবা থেকে তারপর কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের ফল হচ্ছে আজকের আমরা আধুনিক মানুষ। এখন পর্যন্ত এটিই হচ্ছে বৈজ্ঞানিক সত্য।
পদার্থবিদ্যায় থার্মোডাইনামিক্সের দ্বিতীয় সূত্র অনুযায়ী, প্রতিনিয়ত মহাবিশ্বের এন্ট্রপি বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোন এক সিস্টেমের বিশৃঙ্খলাই হচ্ছে এনট্রপি। এনট্রপির কাজ হচ্ছে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা। মানে শক্তির ক্ষয়। প্রকৃতির কাজ হচ্ছে পুঞ্জীভূত শক্তিকে সমানভাবে ছড়িয়ে দেওয়া। এভাবে একদিন শক্তি ক্ষয় হতে হতে কোন কিছুই আর কাজ করবে না। কোন রকম ইলেক্ট্রিক বস্তু, যেমনঃ টিভি, ফ্রিজ, ঘড়ি, কম্পিউটার কোন কিছু কাজ করবে না। রান্না করার জন্য চুলা, গাড়ি, কলখারখানা কোন কিছুই চলবে না। একদিন মহাবিশ্বের তাপীয় মৃত্যু হবে। সেদিন সব কিছু একই স্তরে চলে আসবে, একই শক্তিতে পরিণত হবে। কেউ কারো চেয়ে কম কিংবা বেশি হবে না। মজার বিষয় হচ্ছে, আমরা জানি বা না জানি, পৃথিবীর সকল মানুষ একই উদ্দেশ্যে প্রকৃতিতে নিয়োজিত রয়েছে, আমাদের প্রত্যেকটি কাজ মহাবিশ্বের এন্ট্রপি বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে, এনট্রপির বৃদ্ধির মেশিন হিসেবে কাজ করছি আমরা, প্রতিনিয়ত এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড থেকে শক্তি গ্রহণ করে সেটা ছড়িয়ে দিচ্ছি, মানে আমরা যত বেশি শক্তির ক্ষয় করছি তত বেশি মহাবিশ্বের তাপীয় মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। মানুষের জীবন হচ্ছে মূলত পুঞ্জীভূত শক্তি ছড়িয়ে দেয়ার একটি হাতিয়ার। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলার পথেই এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এভাবে আমরা সবাই একই বস্তুতে পরিণত হওয়ার জন্য নিজেদের ধাবিত করছি। বিষয়টি ইন্টারেস্টিং না?
আসলে মানুষের জীবনের পরম কোন অর্থ নেই। এটা সম্পুর্ন ব্যাক্তিগত বিষয়। দার্শনিক আল্বার্ট কাম্যু বলেন "তুমি যদি জীবনের অর্থ খুঁজে বেড়াও তাহলে জীবনকেই উপভোগ করতে পারবে না"। তোমার জীবনের উদ্দেশ্য তোমাকেই খুঁজে বের করতে হবে। তোমার জিবনের অর্থ তোমাকেই তৈরি করতে হবে। তুমি যখন তোমার জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য খুঁজে পাবে তখন তোমার জিবন অর্থপূর্ন হয়ে উঠবে। একটি অর্থপূর্ন জীবনই তোমাকে শান্তি দিতে পারবে।
এমনভাবে বেঁচে থাকো যেন এটি তোমার দ্বিতীয় জীবন এবং প্রথমবার যে ভুলগুলো করেছো সেগুলো আবার করতে যাচ্ছ। গুরুত্ব বুঝে সঠিক জায়গায় সময় এবং শক্তির যথাযথ ব্যবহার কর। শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়েই সুস্থভাবে বেঁচে থাকা যায়। জীবনটাকে যদি একটা অনন্ত সিঁড়ি মনে কর তাহলে সেই সিঁড়ি বেয়ে চলার মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত আনন্দ।
