ফ্রয়েডের মনঃসমীক্ষণ তত্ত্ব

Sigmund Freud

মনঃসমীক্ষণ তত্ত্ব

সিগমন্ড ফ্রয়েড এবং তার অনুসারীরা ব্যক্তিত্বের ওপর যে কাজ করেছেন তা মনঃসমীক্ষণ তত্ত্ব (psychoanalytic theory) নামে পরিচিত। ব্যক্তির অবচেতন প্রেম এবং দ্বন্দ্বের স্বরূপ জানার জন্য ফ্রয়েড অবাধ অনুষঙ্গ (free association) এবং স্বপ্ন বিশ্লেষণ (dream interpretation) কৌশল ব্যবহার করতেন। অবাধ অনুষঙ্গ নীতির ফলে রোগী তার সমস্যাগুলো খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করতে পারত। স্বপ্ন বিশ্লেষণপদ্ধতিতে একজন ব্যক্তির শৈশবকালীন স্মৃতি, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সম্পর্ক, সমস্যা, ভবিষ্যৎ-কর্মপরিকল্পনা সম্বন্ধে জানা যায়। ফ্রয়েডের মতে রোগীর চিন্তাভাবনা, আশা, আকাঙ্ক্ষা, অবচেতন প্রেম রোগীর স্বপ্নে প্রতিফলিত হয়ে থাকে। এ পর্যায়ে আমরা ব্যক্তিত্বের গঠন, বিকাশ এবং গতিশীলতা সম্বন্ধে ফ্রয়েডের ধারণা আলোচনা করব।

ব্যাক্তিত্বের গঠন (structure of personality)


১. আদিসত্তা ( id) : আদিসত্তা ব্যক্তিত্বের একটি প্রাথমিক সত্তা। এ সত্তাটি মানসিক শক্তির (psychic energy) আধার। একে মানসিক শক্তির মৌলিক সংরক্ষণাগার বলা হয়। আদিসত্তা থেকে শক্তি সংগ্রহ করে অহম ও অধিসত্তা তাদের কাজ করে থাকে। আদিসত্তা সুখভোগের নীতি (pleasure principles) মেনে চলে। এটি সকল সময়ই সুখ পেতে চায়, কোনো প্রকার যুক্তি, বিচারবুদ্ধি বা নৈতিক জ্ঞানের ধার ধারে না। এটি ব্যক্তিত্বের একটি অবচেতন স্তর। এ সত্তাটি অন্ধের মতো জৈবিক প্রেষ চরিতার্থ করার জন্য ব্যস্ত থাকে ।

২. অহম (ego) : অহম ব্যক্তির বাস্তব সত্তা। এ সত্তার কাজ হলো আদি কামনা ও বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় সাধন করা। এ সত্তাটি বাস্তবধর্মী নীতি (reality principle) অনুসরণ করে। বাস্তবধর্মী নীতির উদ্দেশ্য হলো যথাযোগ্য বস্তুর সাহায্যে প্রয়োজন মেটানো। এ নীতির কাজ হলো অভিজ্ঞতা সত্য কি মিথ্যা তা দেখা।

অহমকে ব্যক্তিত্বের কার্যনির্বাহী সত্তা বলা যেতে পারে। এটি ব্যক্তির সকল কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে। আদিসত্তার কোন কামনা পূর্ণ করতে হবে তা অহম ঠিক করে থাকে। আদিসত্তা ও অধিসত্তার বহু পরস্পরবিরোধী দাবি-দাওয়ার মধ্যে সমন্বয় সাধন করে অহম। ফ্রয়েডের মতে অহম যখন আদিসত্তার তীব্র কামনা ও অধিসত্তার কঠোর নিয়মকানুনের মুখে তার সমন্বয় সাধনক্ষমতা হারিয়ে ফেলে তখন ব্যক্তিত্বের বিপর্যয় ঘটে।

৩. অধিসত্তা (super ego) : ব্যক্তিত্ব কাঠামোর তৃতীয় এবং সর্বশেষ সত্তা হলো অধিসত্তা। এ সত্তাটি ব্যক্তিত্বের নৈতিক হাতিয়ার। আমরা যাকে বিবেক বলি তাই অধিসত্তা। এ সত্তাটি বাস্তব অপেক্ষা ন্যায়-নীতির প্রতি বেশি জোর দিয়ে থাকে। সামাজিক ন্যায়-নীতির ভিত্তিতে এটি ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করে।

অধিসত্তার প্রধান কাজ হলো তিনটি। যথা :
১) অধিসত্তার কাম এবং আক্রমণাত্মক প্রেষকে অবদমন করে।
২) অহমকে বাস্তবধর্মী লক্ষ্যবস্তুর পরিবর্তে আদর্শধর্মী লক্ষ্যে প্রভাবিত করা এবং
৩) আরাম আয়েস অপেক্ষা পূর্ণতা অর্জনে ব্যক্তিকে উদ্বুদ্ধ করে।

ব্যক্তিত্ব বিকাশের পর্যায় (stages of psycho-sexual development)


ফ্রয়েড বিশ্বাস করেন একজন শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশে প্রথম পাঁচ বছর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিত্ব বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়কে মানস-যৌন (psychosexual) স্তর বলা যায়। মানস-যৌন বিকাশের স্তরগুলো নিয়ে আলোচনা করা হলো।

১. মৌখিক পর্যায় (the oral stage) : শিশু জীবনের সর্বপ্রথম স্তর হলো মৌখিক পর্যায়। শিশুর জন্মের শুরু থেকে ১৮ মাস পর্যন্ত এ স্তরটি সীমিত। এ সময় শিশুর যৌনপ্রেষণা তার মুখে ও ঠোঁটে সীমাবদ্ধ থাকে। এ পর্যায়ে শিশুরা চুষতে আনন্দ পায়, তারপর যখন দাঁত ওঠে তখন কামড়াতে ও চিবাতে পছন্দ করে। কামড়ানো অর্থাৎ মৌখিক পর্যায়ের আক্রমণাত্মক ভাব পরবর্তীকালে বক্রোক্তি এবং তর্ক করার প্রবণতা জাগিয়ে তুলতে পারে।

২. পায়ুপর্যায় (the anal stage) : প্রায় দু বছর বয়সে পায়ুপর্যায় আরম্ভ হয়। এসময়ে শিশুর পায়ু অঞ্চল খুব সংবেদনশীল থাকে এবং সে মলত্যাগ করে আনন্দ লাভ করে। পিতা-মাতা এ সময় শিশুকে পায়খানা-প্রস্রাবের ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। মলত্যাগের প্রশিক্ষণের ওপর ভিত্তি করে শিশুর পরবর্তী জীবনের মূল্যবোধ সৃষ্টি হয়। মা যদি প্রশিক্ষণের ব্যাপারে খুব অনমনীয় হয় তবে শিশু মল ত্যাগ না করে একে ধরে রাখার চেষ্টা করবে এবং এর ফলে সে কোষ্ঠকাঠিন্যে আক্রান্ত হবে। এরূপ প্রতিক্রিয়া যদি পরবর্তী জীবনে স্থানান্তরিত হয় তা হলে সে একগুঁয়ে এবং কৃপণ হতে পারে।

৩. লিঙ্গকাম পর্যায় (phallic stage) : তিন থেকে চার বছর বয়সে লিঙ্গকাম পর্যায় শুরু হয়। এ বয়সে তার নিজের যৌনঅঙ্গকে উদ্দীপিত করে সুখ লাভ করে। এজন্য এ পর্যায়কে লিঙ্গকাম পর্যায় বলা হয়। এ পর্যায়ে কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে থাকে, যা ব্যক্তিত্ব বিকাশের সাথে জড়িত; যেমন, ইডিপাস গুঢ়ৈষা (oedipus complex) লিঙ্গচ্ছেদন আশঙ্কা (castration anxiety) এবং পুরুষলিঙ্গ হিংসা (penis envy)। ইডিপাস গুঢ়ৈষা অনুযায়ী বলা যায়, শিশুর প্রথম আসক্তি হলো তার পিতা-মাতা। ছেলে মাতাকে তার আসক্তির পাত্র বলে মনে করে এবং পিতাকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে। শিশুর এরূপ মনোভাবকে ইডিপাস গুঢ়ৈষা বলা হয়। পিতার প্রতি কন্যা সন্তানের যে আসক্তি তাও ইডিসি গুঢ়ৈষার অন্তর্ভুক্ত। ফ্রয়েড এ গুঢ়ৈষার নাম দিয়াছেন ইলেকট্রা গুঢ়ৈষা।

লিঙ্গচ্ছেদন আশঙ্কা ছেলেদের মধ্যে দেখা যায়। কারণ মায়ের প্রতি ছেলের যে আসক্তি জন্মায় তা আবার পিতার ভয়ে ধীরে ধীরে দূরীভূত হয়। ছেলে মনে করে পিতা তাকে শাস্তি হিসেবে তার লিঙ্গ কেটে দেবে। পিতা কর্তৃক তার লিঙ্গচ্ছেদনের সম্ভাবনা আছে বলে ছেলে মায়ের প্রতি আসক্তি এবং পিতার প্রতি বিরূপ ভাবকে অবদমন করে ফেলে। এ সময় ছেলে পিতার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে এবং মায়ের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার সৃষ্টি হয়।

লিঙ্গকাম পর্যায়ের আরেকটি ঘটনা হলো পুরুষলিঙ্গ হিংসা। শিশুকন্যা যখন হঠাৎ একটি ছোট ছেলের লিঙ্গের দিকে তাকায় তখন তার মনে প্রশ্ন জাগে এরূপ লিঙ্গ তার নেই কেন? এ জন্য সে মাতাকে দায়ী করে। তাই দেখা যায় যে, পরবর্তীকালে সে তার পিতার প্রতি এবং অন্যান্য পুরুষের প্রতি হিংসাত্মক মনোভাব পোষণ করে।

৪. সুপ্তি পর্যায় (latency stage) : এ পর্যায়ের কাল ৫ বছর থেকে যৌবনাগমন পর্যন্ত । এ সময় যৌনপ্রবৃত্তির কোনো রকম বহিঃপ্রকাশ থাকে না, তবে শিশুর মধ্যে যৌনতার বিভিন্ন লক্ষণসমূহের অগ্রগতি লক্ষ করা যায়।

৫. যৌনপর্যায় (genital stage) : এ পর্যায়ে ছেলেমেয়েদের মধ্যে যৌনকাম অনুভূতি সৃষ্টি হয়। এ সময় তাদের মধ্যে একটি পরিপূর্ণ ভালোবাসার উদয় হয় এবং বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবার ইচ্ছা পোষণ করে।

ব্যক্তিত্বের গতিশীলতা (dynamics of personality)


ফ্রয়েডের মতে ব্যক্তিত্বকে গতিশীল করে তুলেছে এক প্রকার মানসিক শক্তি। মানসিক শক্তি খাদ্যদ্রব্য গ্রহণের মাধ্যমে অর্জিত হয় এবং রক্তসঞ্চালন, পেশিসঞ্চালন, শ্বাস-প্রশ্বাস, প্রত্যক্ষণ, শিক্ষণ ইত্যাদি কাজের মাধ্যমে মানসিক শক্তির ব্যয় হয়। সহজাত প্রবৃত্তির মাধ্যমে মানসিক শক্তির বিকাশ ঘটে থাকে।

সহজাত প্রবৃত্তি (instinct) : সহজাত প্রবৃত্তি হলো অভ্যন্তরীণ শারীরিক উত্তেজনার মানসিক রূপ। মানসিক রূপকে বলা হয় ইচ্ছা (wish) এবং যে শারীরিক উত্তেজনার মাধ্যমে এটি সৃষ্টি হয় তাকে চাহিদা বা অভাব (need) বলে। সুতরাং শরীরের কলায় (tissue) যে পুষ্টির অভাব দেখা দেয় তাকে শারীরবৃত্তীয় দিক থেকে 'ক্ষুধা' বলে এবং মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে একে 'খাবারের চাহিদা' হিসেবে প্রকাশ করা হয়। এ খাবারের চাহিদা প্রাণীর আচরণে প্রেষ হিসেবে কাজ করে। মানুষ ক্ষুধার্ত হলে খাদ্যের অন্বেষণে বের হয়। এখানে ক্ষুধা একটি সহজাত প্রবৃত্তি। এ সহজাত প্রবৃত্তি আচরণের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। সহজাত প্রবৃত্তির ৪টি বৈশিষ্ট্য আছে : যথা : ১. উৎস ২. লক্ষ্য ৩. উদ্দেশ্যবস্তু এবং ৪. অনুপ্রেরণা। শারীরিক চাহিদা হলো প্রবৃত্তির উৎস। এ শারীরিক চাহিদা দূরীকরণই হলো প্রবৃত্তির লক্ষ্য। এরূপ চাহিদা বা প্রয়োজন মেটাবার জন্য যেসব কাজ একজনকে করতে হয় তার সমষ্টি হলো উদ্দেশ্য বস্তু এবং অনুপ্রেরণা হলো প্রবৃত্তির শক্তি। ফ্রয়েড সহজাত প্রবৃত্তিগুলোকে দুভাগে ভাগ করেন, যথা : জীবনপ্রবৃত্তি এবং মৃত্যুপ্রবৃত্তি। জীবনপ্রবৃত্তির সাহায্যে ব্যক্তি আত্মরক্ষা এবং বংশবৃদ্ধির কাজে লিপ্ত থাকে। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, কাম ইত্যাদি জীবনপ্রবৃত্তির অন্তর্ভুক্ত। যে শক্তির মাধ্যমে এ প্রবৃত্তি কাজ করে তাকে ফ্রয়েড লিবিডো (libido) নামে আখ্যায়িত করেন। যুদ্ধ করার এবং হত্যা করার প্রবৃত্তিকে মৃত্যুপ্রবৃত্তি বলা হয়। মানুষ মাত্রই মরণশীল, তাই ফ্রয়েড বলেন জীবনের উদ্দেশ্যই হলো মৃত্যু।

প্রতিরক্ষামূলক কৌশল (defence mechanism)


বাস্তবসম্মত সমস্যার প্রতি মোকাবেলা করতে গিয়ে ব্যক্তির মধ্যে হতাশা, উদ্বেগ এবং নেতিবাচক আবেগগত অভিজ্ঞতা দেখা যায়। ফ্রয়েডের মতে, অহমের জন্য বিপজ্জনক সংকেত হলো দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ। উদ্বেগ কোনো বাস্তবসম্মত ভীতি থেকে দেখা দিতে পারে; যেমন, কোনো বিষাক্ত সাপ দেখলে দুশ্চিন্তার সৃষ্টি হয় এবং এ জন্য যে এটি কামড় দিতে পারে। যেহেতু দুশ্চিন্তা একটি অপ্রীতিকর বিষয় ফ্রয়েড বিশ্বাস করেন যে, ব্যক্তি কতকগুলো প্রতিরক্ষামূলক কৌশলের মাধ্যমে এসব উদ্বেগের মোকাবেলা করে। দুশ্চিন্তা থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য ব্যক্তি যেসব প্রতিক্রিয়া করে সেগুলোকে প্রতিরক্ষামূলক কৌশল বলে। প্রতিরক্ষামূলক কৌশলকে আত্মরক্ষামূলক কৌশলও বলা হয়। ফ্রয়েডের মতে ব্যক্তির অহম যখন আদিসত্তা এবং অধিসত্তার সাথে বাস্তব সমন্বয় সাধন করতে পারে না তখন সে নিজের ব্যর্থতাকে ঢেকে রাখার জন্য প্রতিরক্ষা কৌশলসমূহ অবলম্বন করে।

প্রতিরক্ষামূলক কৌশলসমূহ


অবদমন (repression) : অপ্রীতিকর বা অগ্রহণযোগ্য উত্তেজনাকে গভীরে রাখা হয়। অবচেতনের।
উদাহরণঃ একজন মহিলা কোনো একটি অপৃতিকর ঘটনাকে পুনরুদ্ধার করতে অসমর্থ।

প্রত্যাবৃত্তি (regression) : ব্যক্তি হতাশাগ্রস্ত হয়ে শিশুসুলভ আচরণ করে থাকে।
উদাহরণঃ পিতা-মাতার মনোযোগ আকৃষ্টের জন্য ছেলে-মেয়েরা নতুন শিশুর মতো কান্নাকাটি করে।

স্থানচ্যুতি (displacement) : অধিক শক্তিশালী ব্যক্তির প্রতি আক্রমণধর্মী মনোভাব ব্যক্ত করা বিপজ্জনক মনে করে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ব্যক্তি দুর্বল ব্যক্তিকে আক্রমণ করে থাকে।
উদাহরণঃ শিক্ষক কর্তৃক তিরস্কৃত হয়ে বড় ভাই তার ছোট ভাই-বোনের সাথে খারাপ ব্যবহার করতে পারে।

যুক্তাভ্যাস (rationalization) : দুশ্চিন্তা কমানোর জন্য ব্যক্তি এমন যুক্তি প্রদর্শন করে যা বাস্তবে প্রমাণ হয় না।
উদাহরণঃ একজন চাকরিপ্রার্থী কোনো একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি না পেয়ে বলতে পারে যে, ঐ প্রতিষ্ঠানে চাকরি না পেয়ে ভালো হয়েছে; কারণ এখানে সুযোগসুবিধা খুবই কম এবং যাতায়াতের অসুবিধা রয়েছে।

অস্বীকৃতি (denial) : দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ব্যক্তি অনেক সময় তার দুশ্চিন্তার কথা অস্বীকার করে থাকে।
উদাহরণঃ কোনো ব্যক্তি রাগ করার পর যখন বুঝতে পারল যে, রাগ করা তার মোটেও ঠিক হয়নি; তখন সে জোর দিয়ে বলতে শুরু করল যে, সে মোটেও রাগ করেনি।

প্রক্ষেপণ (projection) : দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ব্যক্তি নিজের দোষ এবং অক্ষমতাকে অন্যের ওপর আরোপ করে।
উদাহরণঃ পরীক্ষায় অকৃতকার্য পরীক্ষার্থী বলতে পারে যে, পরীক্ষক তার উত্তরপত্র যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেননি। এ জন্য সে পরীক্ষায় খারাপ করেছে।

উদগতি (sublimation) : দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ব্যক্তি তার অপ্রীতিকর উত্তেজনা কমানোর জন্য কিছু সামাজিক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে।
উদাহরণঃ একজন যুবক প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কবিতা লিখতে পারে বা সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে পারে।

প্রতিক্রিয়া গঠন (reaction formation) : ব্যক্তির কোনো চিন্তা-ভাবনা, অনুভূতি যখন তার মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে, তখন সে বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া করে থাকে।
উদাহরণঃ একজন খুনি তার অপরাধকর্মের গ্লানি থেকে মুক্তি পাবার জন্য ধর্মীয় কাজে নিয়োজিত হতে পারে।

মনঃসমীক্ষণ মতবাদ মনোবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়। মানুষের ব্যাক্তিত্বের ব্যাখ্যায় এ তত্ত্বটি অনেকটাই সফল। তাই আধুনিক মনোবিজ্ঞানের চিন্তা এবং গবেষণার ক্ষেত্রে মনঃসমীক্ষণের প্রবল প্রভাব রয়েছে।

ফ্রয়েডের চিকিৎসাপদ্ধতি

ফ্রয়েডের মনোবিশ্লেষণ পদ্ধতি এবং তার চিকিৎসা পদ্ধতি খুবই অভিনব এবং চিত্তাকর্ষক। প্রথমতঃ ব্যক্তিত্বের বিকাশ এবং নিউরোসিস (স্নায়ুরোগ) এর উৎপত্তির কারণগুলো সাধারণ পদ্ধতিতে জানা যাবে না। কারণ, বাস্তবতার চাপে অথবা বিবেকের পরিপন্থী হওয়ায় অনেক কামনা বাসনা এবং অনেক বেদনাময় অভিজ্ঞতা আমরা অবদমন করে থাকি। এগুলো মনের নিজ্ঞান স্তরে (unconscious) জমা থাকে। এগুলো এমন কি প্রাচেতন মনেও থাকেনা যাতে করে একটু চেষ্টা করলেই মনে করা যাবে। নিজ্ঞান মনে থাকে বলে এসব দুঃখময় স্মৃতি বা অবদমিত কামনাবাসনাগুলোর কথা ব্যক্তি জানতে পারে না। সুতরাং এসব অবদমিত অভিজ্ঞতাগুলোকে স্মরণে আনতে গেলে বাধার (Resistence) সৃষ্টি হয়। এই বাধা অপসারণ করে অচেতনের অভিজ্ঞতা সমূহকে চেতন স্তরে আনতে গেলে কৌশলের প্রয়োজন।

এই কৌশলগুলো হলো: হিপনোসিস, মুক্ত অনুষঙ্গ (Free association), স্বপ্ন বিশ্লেষণ, ইত্যাদি।

স্বপ্ন যেহেতু যথেষ্ট পরিমানে প্রাথমিক প্রক্রিয়া সমূহ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, সেহেতু স্বপ্নগুলোকে যদি সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায় তাহলে সেগুলোর মাধ্যমে অচেতন মন সম্পর্কে জানা যায়। ফ্রয়েড আবিষ্কার করেন যে, স্বপ্নের মাধ্যমে ব্যক্তি তার অবদমিত কামনা বাসনা পূরণ করে থাকে। অর্থাৎ ইদ যেহেতু অলীক কল্পনার মাধ্যমে কোন ইচ্ছা পূরণ এবং বাস্তবে ইচ্ছা পূরণের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না সেজন্য বর্তমান মানসিক তাগিদ এবং চাপগুলো স্বপ্নের মাধ্যমে বহিঃপ্রকাশ পায়। একটি স্বপ্নের বাহ্য অর্থ ও অন্তর্নিহিত অর্থ এক নয়। স্বপ্নের অন্তর্নিহিত বা প্রচ্ছন্ন (Latent) অর্থ জানতে হলে অর্থাৎ স্বপ্নের মাধ্যমে কোন্ অতৃপ্ত ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তা আবিষ্কার করতে হলে স্বপ্নের বিভিন্ন উপাদানের প্রতি ব্যক্তির অনুষঙ্গগুলি জানতে চাওয়া হয়। এইভাবে স্বপ্নের বিভিন্ন সংকেত (Symbol) এর অর্থ আবিষ্কার করা হয় এবং অবদমিত অভিজ্ঞতা বা বিষয়গুলি চেতনায় প্রতিফলিত করাহয়। অবদমিত ঘটনাবলীর স্মৃতি পুনরুদ্ধারের বাধা দূর করা বেশ কঠিন ব্যাপার এবং এটাই মনোসমীক্ষকের প্রধান কর্তব্য। অনেক সময় ব্যক্তিকে তার অবদমিত ঘটনাবলীর কথা মৌখিক ভাবে বললেও সে তা গ্রহণ করতে চায়না। রোগী যখন তার অবদমিত ঘটনাগুলোকে গ্রহণ করার জন্য বিবেকের বাধাগুলো দূর করতে পারে তখনই তার আরোগ্য লাভের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। বিবেকের বাধাগুলো দূর হয়ে যাওয়ার ফলে, সে অচেতনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা স্মৃতিগুলোকে চেতন স্তরে নিয়ে আসতে পারে এবং ইগো বা অহং এর নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। এভাবে যখন ইগোর নিয়ন্ত্রণের পরিধি ব্যাপকতর হয়, তখন ইগোর শক্তি বৃদ্ধি পায়। এবং রোগী তার আকাঙ্খা বা প্রবৃত্তিগুলোকে যুক্তির শাসনে রাখতে পারে। যদিও রোগী কখনও সুখ নীতি থেকে মুক্ত হতে পারে না, তবু ও সে বাস্তবের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তার বেশীর ভাগ প্রেষণার একটা মোটামুটি গ্রহণযোগ্য সন্তুষ্টি পেতে শিখে। এটাই মনোচিকিৎসার লক্ষ্য।

মনোচিকিৎসার একটি পর্যায়ে, বিশেষ করে রোগী যখন তার অবদমিত অভ্যন্তরীণ জটিলতাগুলোকে প্রকাশ করতে চায়না, তখনন স্থানান্তর করণ (Transference) এর সাহায্য নেওয়া হয়। রোগী অনেক সময় তার আদিম কামনাগুলিকে (Libidinal energy) চিকিৎসকের উপরে স্থানান্তর করে। চিকিৎসক এই শক্তিটাকে অবদমনের বাধা কাটিয়ে উঠার জন্য ব্যবহার করতে পারেন। তাছাড়া স্থানান্তরকরণ নিজেই মনোসমীক্ষণের একটি বিশ্লেষণের বিষয়। স্থানান্তর করণে রোগী তার জটিল অনুভূতিগুলি এবং অপূর্ণ আকাঙ্খাগুলি চিকিৎসকের উপরে আরোপ করে। যেমন সে চিকিৎসককে প্রেমিক/প্রেমিকা বা পিতার আসনে বসায়। এই সম্পর্কটি বিশ্লেষণ করতে হবে। রোগী যখন চিকিৎসককে চিকিৎসক হিসাবে ভাবতে শুরু করবে তখনই শুধু সে স্বাধীনভাবে তার সমস্যাগুলোকে সমাধান করতে পারবে। স্থানান্তর করণ থেকে মুক্তি লাভ করলেই শুধু রোগীর অসুখ সেরেছে বলে মনে করতে হবে।

অনেক সময় দেখা গেছে, নিউরোসিসের মূল কারণ হলো শৈশবকালীন যৌন অভিজ্ঞাতার অথবা অযাচিত যৌন কামনার অবদমন। সুতরাং রোগীর চিকিৎসা করতে গিয়ে তাকে সেই সুদূর অতীতের স্মৃতিগুলো মনে আনতে হবে। শৈশবের দিনগুলো ব্যক্তির বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় কঠিন শাস্তির দরুন বা ব্যর্থতার দরুণ শিশুর বিকাশ এই পর্যায়ে থেমে যায়, যাকে বলা হয় স্থিরীভবন (Fixation)। আবার অনেক সময় স্বাভাবিক বিকাশ হলেও অস্বাভাবিক পরিস্থিতির চাপে সে তার শৈশবকালে ফিরে যায়, শৈশবের আচরণের পুনরাবৃত্তি করে। এটাকে বলা হয় প্রত্যাবৃত্তি (regression)। যে সব শৈশবকালীন অভিজ্ঞতার শাস্তি পাওয়ার এবং অবদমন করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশী সেগুলো হলো যৌনতা সংক্রান্ত। সুতরাং মনোচিকিৎসার একটি প্রয়োজনীয় কৌশল হলো সমীক্ষণের মাধ্যমে শৈশবের যৌন অভিজ্ঞতাগুলো অচেতনের স্তর থেকে চেতন স্তরে নিয়ে আসা। অর্থাৎ অন্য কথায় বলা চলে, মনোবিশ্লেষণের কেন্দ্রীয় উদ্দেশ্য হলো ইডিপাস কমপ্লেক্স ও এর সফল সমাধান করতে রোগীকে সাহায্য করা। রোগীর অন্তর্দৃষ্টি লাভ তখনই হবে যখন রোগী তার সমস্যাটিকে বুঝতে পারবে এবং নিজের তার ইডিপাস কমপ্লেক্স ও অন্যান্য যৌনতা সম্পর্কিত সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারবে।

ফ্রয়েডের মনোসমীক্ষণের একটি উল্লেখযোগ্য ধারণা হলো মানসিক নিদ্ধারণবাদ (Psychic determinism)। মানসিক রোগের লক্ষণগুলো যেমন শৈশবের যৌন অভিজ্ঞতাগুলির দ্বারা নির্ধারিত, ঠিক তেমনিভাবে প্রতিটি ব্যক্তির ভুলগুলি--লেখার ভুল, বা কথার ভুল, বা কাজের ভুল, ইত্যাদি বিস্মৃতিগুলিও মানসিকভাবে নির্ধারিত। এ ধরণের ভুলগুলিকে দৈব ঘটনা বলে মনে হলেও প্রকৃত পক্ষে এগুলোর কারণ। ব্যক্তির অচেতন মনে লুক্কায়িত কিছু প্রেষণা। এ সম্পর্কে ফ্রয়েড একটি দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। (১৯৩৮)। একটি সংস্থার (united daughters of the confederacy) একজন মহিলা সদস্যা তার বক্তৃতায় প্রেসিডেন্ট জেফারসন ডেভিসকে প্রশংসা করতে গিয়ে বলেনঃ

"The great and only president of the confederate states of America -Abraham Lincoln".

অর্থাৎ এই মহিলা তার নিজে সংস্থার প্রেসিডেন্টের নামের বদলের আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট এব্রাহাম লিংকনের নাম বলে ফেলেন। এতে স্পষ্টতঃই মনে হচ্ছে মহিলা তার নিজের সংগঠনে না থেকে অন্য সংগঠনে থাকতে চান।

ফ্রয়েডের মনোসমীক্ষণ তত্ত্বের একটি বিশেষত্ব হলো এই যে তার তত্ত্বে এটি দেখানো হয়েছে যে, যদি আদিম প্রবণতাগুলোকে (impulse) গৌণ প্রক্রিয়া সমূহের নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, তাহলে নির্ধারণবাদকে বাতিল করা যায়। এভাবে রোগী প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ থেকে নিজেকে মুক্ত করে আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। গৌণ প্রক্রিয়াসমূহের মধ্যে নির্ধারণবাদের কার্যকারিতা সম্পর্কে তিনি এতটা সচেতন ছিলেন না। তবে তার অনুসারীদের মধ্যে অনেকেই 'ইগো' প্রক্রিয়া সমূহ অনুধ্যান করার জন্য প্রচুর সময় দিয়েছেন। ফ্রয়েড মনে করতেন যে, মানুষকে প্রকৃত পক্ষে যুক্তিবাদী হতে হবে, তাহলেই তার উন্নতি সম্ভব। ফ্রয়েড ও তার সঙ্গীদের কেউই মনে করতেন না যে, অন্তদৃষ্টি লাভ নিউরোসিস থেকে আরোগ্য লাভের একমাত্র উপায়, তবে তারা মনে করতেন এটা একটা অত্যাবশ্যকীয় শর্ত। তাছাড়া তাঁরা মনে করতেন যে, অন্তর্দর্শন খুব গভীর হওয়া দরকার, তা না হলে চিকিৎসায় কোন উপকার হবেনা। রোগীকে বিশ্লেষণের ফলাফল আবেগীয়ভাবে গ্রহণ করতে হবে, শুধুমাত্র কথার কথা হিসাবে ভাসাভাসাভাবে বিশ্লেষণের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করলেই চলবে না।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url