কার্ল ইয়ংয়ের ব্যক্তিত্বের মনস্তাত্ত্বিক প্রকারভেদ তত্ত্ব

Personality types theory

ব্যক্তিত্ব

ব্যক্তিত্ব হল ব্যক্তির সকল বৈশিষ্ট্যের একটি সামঞ্জস্য ধারা যা তার আচরণে প্রকাশ পায়। ব্যক্তির দৈহিক গঠন, চেহারা, শক্তি, সামর্থ্য এবং তার বিশ্বাস, মনোভাব, মূল্যবোধ, আবেগ, প্রকাশভঙ্গি প্রভৃতির সমন্বয়ে ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি হয়। প্রত্যেক ব্যক্তিরই ব্যক্তিত্ব রয়েছে, কারো ব্যক্তিত্ব নেই এ কথা বলা যায় না।

সুইজারল্যান্ডের মনোবিজ্ঞানী কার্ল ইয়ং মানসিক গুণাবলির ভিত্তিতে ব্যক্তিত্বের শ্রেণী বিভাগ করেছেন বলে তাঁর মতবাদকে মনস্তাত্ত্বিক প্রকারভেদ বলা হয়।

তিনি ব্যক্তিত্বকে দু'টি শ্রেণীতে বিভক্ত করেন। যথাঃ অন্তর্মুখী ব্যক্তিত্ব, (introvert) এবং বহির্মুখী ব্যক্তিত্ব (extrovert)।

অন্তর্মুখী ব্যক্তিত্ব : অন্তর্মুখী ব্যক্তিরা একা ও আলাদা থাকতে পছন্দ করে। এ ধরনের ব্যক্তিরা খুব চিন্তাশীল ও সৃজনশীল প্রতিভার অধিকারী হয়। তারা তাদের সুপ্ত প্রতিভার বিকশিত করতে বদ্ধপরিকর। বিশেষতঃ তারা, সাহিত্য, শিল্পকর্ম এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানে অবদান রাখতে সক্ষম ।

বহির্মুখী ব্যক্তিত্ব : বহির্মুখী ব্যক্তিরা বাইরের জগতের বিভিন্ন কর্ম কাণ্ডের সাথে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। তারা অন্যদের কাজকর্ম করতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করে। ব্যবসা-বাণিজ্য, খেলা-ধূলা, সমাজ সেবা, বিদেশ সফর প্রভৃতি কাজ তাদের অতি প্রিয়।

উভয়মুখী ব্যক্তিত্ব: কার্ল ইয়ূং ব্যক্তিত্বকে দু'টি শ্রেণীতে বিভক্ত করেন। এরূপ শ্রেণী বিভাগের অসুবিধা হল যে, অধিকাংশ ব্যক্তিই অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী ব্যক্তিত্বের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থান করে। অন্তর্মুখী ব্যক্তিত্ব সব সময় অন্তর্মুখী থাকে না এবং বহির্মুখী ব্যক্তিত্বও সর্বদা বহির্মুখী থাকে না। অর্থাৎ অন্তর্মুখী ব্যক্তিত্ব বহির্মুখী হতে পারে এবং কখনও কখনও বহির্মুখী ব্যক্তিত্ব অন্তর্মুখী হতে পারে। এরূপ ব্যক্তিত্বকে উভয়মুখী ব্যক্তিত্ব (ambivert personality) বলা হয়। উপরন্ত, ইয়ুং চারটি কার্যাবলি সম্বন্ধে আলোচনা করেছিলেন। যথাঃ সংবেদন, স্বতঃলব্ধ জ্ঞান, চিন্তন এবং অনুভূতি ।

সংবেদন এবং স্বতঃলব্ধ জ্ঞান (sensation and intuition): সংবেদন এবং স্বতঃলব্ধ জ্ঞানের সাহায্যে ব্যক্তি পরিবেশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। সংবেদন হল বস্তু সম্মন্ধে জ্ঞান যা ব্যক্তি পাঁচটি ইন্দ্রেয়ের মাধ্যমে লাভ করে। স্বতঃলব্ধ জ্ঞান হল যা পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সাহায্য ব্যতীরেকে দার্শনিক অর্থে চরম বা সর্বশেষ অভিজ্ঞতা লাভ করা।

চিন্তন ও অনুভূতি (thinking and feeling): চিন্তন ও অনুভূতির মাধ্যমে ব্যক্তি তার অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে বিশ্লেষণ করে। চিন্তন হল বিচার বিবেচনার ক্ষেত্রে যুক্তির প্রয়োগ। অন্যদিকে, অনুভূতি হল আবেগ ও মূল্যবোধের প্রয়োগ। সাধারণত প্রত্যেক ব্যক্তি একটি কার্যের উপর নির্ভর করবে। কিন্তু ইয়ুং অনুভব করেন যে অন্যান্য কার্যাবলি ব্যক্তির বয়স বৃদ্ধির ফলে বিকশিত হবে। এচারটি কার্যাবলীর সাথে অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী মনোভাব যুক্ত হয়ে আট প্রকারের কার্যাবলি সৃষ্টি হয়। যেমন, অন্তর্মুখী অনুভূতি প্রকার, বহির্মুখী অনুভূতি প্রকার, অন্তর্মুখী চিন্তন প্রকার, বহির্মুখী চিন্তন প্রকার ইত্যাদি। কার্ল ইয়ুং বিভিন্ন ব্যক্তির ব্যক্তিত্বকে এ সব বৈশিষ্ট্যের প্রেক্ষিতে জানার আগ্রহ নিয়ে কাজ করেছিলেন।

কার্ল ইয়ুং এর ব্যক্তিত্বের মনস্তাত্ত্বিক প্রকারভেদ তত্ত্বটি যাচাই করার জন্য মনোবিজ্ঞানী আইসেঙ্ক (eysenck) ১০, ০০০ স্বাভাবিক ও নিউরোসিস নামক মানসিক ব্যধিগ্রস্থ ব্যক্তিকে পর্যবেক্ষণ করেন। এ পর্যবেক্ষণে তিনি ব্যক্তিত্বের দু'টি মৌলিক সংলক্ষণের সন্ধান পান। একটি হল অন্তর্মুখী-বহির্মুখী এবং অন্যটি নিউরোসিস-সাইকোসিস প্রবণতা। গিলফোর্ড বলেন ব্যক্তিত্বকে সম্পূর্ণভাবে অন্তর্মুখী বা বহির্মুখী হিসেবে বিভক্ত করা সম্ভব নয়। গিলফোর্ড অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী ব্যক্তিত্বকে উপাদান বিশ্লেষণ পদ্ধতির সাহায্যে পরীক্ষা করে আরও উপাদানের খোঁজ পান।

নোম্যান ও ইয়াকুজিনেস্কী (১৯৪০) কলেজ ছাত্র ও হাসপাতালের মানসিক রোগী নিয়ে একটি পরীক্ষণ পরিচালনা করেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে, অধিকাংশ ব্যক্তি অন্তর্মুখী ও বহির্মুখীর মাঝামাঝি স্থানে অবস্থান করে।

অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী ব্যক্তিত্বের পার্থক্য

১) অন্তর্মুখী ব্যক্তিত্ব আত্মকেন্দ্রিক এবং বহির্মুখী ব্যক্তিত্ব বহিকেন্দ্রিক। অর্থাৎ অন্তর্মুখী ব্যক্তিরা নিজেদেরকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে এবং বহির্মুখী ব্যক্তিরা সামাজিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত থাকে।

২) অন্তর্মুখী ব্যক্তিরা খুবই চিন্তাশীল এবং সৃজনশীল প্রতিভার অধিকারী। অপরপক্ষে, বহির্মুখী ব্যক্তিরা কম চিন্তাপ্রবণ এবং সৃজনশীল কাজে ভাল করতে পারে না।

৩) অন্তর্মুখী ব্যক্তিরা বহির্মুখী ব্যক্তিদের তুলনায় শিল্প সাহিত্য, দর্শন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অধিক অবদান রাখতে সক্ষম।

৪) অন্তর্মুখী ব্যক্তিরা পরিবেশের সাথে সহজে মিশতে পারে না এবং বহির্মুখী ব্যক্তিরা নতুন পরিবেশের সাথে সহজে মিশতে পারে।

৫) অন্তর্মুখী ব্যক্তিরা পৃথিবীর বিভিন্ন ঘটনার প্রতি খুব একটা আগ্রহ দেখায় না। অন্যদিকে, বহির্মুখী ব্যক্তিরা বাহ্যিক ঘটনাবলি দ্বারা সহজেই প্রভাবিত হয়ে থাকে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url