ঘুম দ্য স্লিপ
প্রতিদিন রাতে চোখ বন্ধ করার পর আমরা ঠিক কোথায় হারিয়ে যাই? কিছু মানুষের ঘুম যেন অতল মহাসাগর, শত কোলাহলেও তারা সেই গভীরে তলিয়ে থাকেন। আবার কারও ঘুম মাকড়সার জালের মতো পাতলা, সামান্য শব্দেও ধড়ফড় করে ফিরে আসেন বাস্তবতায়। অথচ এর কোনোটাই সুস্থতা নয়। সবচেয়ে ভালো ঘুম হলো ঠিক এর মাঝামাঝি একটা অবস্থান, যেখানে আমাদের শরীর ও মন এক নীরব নিরাময় প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়। জীবনের শত দৌড়ঝাঁপে আমরা হয়তো অনেক কিছুই স্যাক্রিফাইস করি, কিন্তু ঘুমের সাথে আপস করা মানে নিজের অস্তিত্বের সাথেই প্রতারণা করা।
মাটির বুকে হাঁটা প্রাণী যেমন সমুদ্রের অন্ধকার গভীরতা বোঝে না, আমরাও আমাদের ঘুমের জগৎ সম্পর্কে তেমনই অন্ধ। বিজ্ঞান আজও শতভাগ নিশ্চিত নয় মানুষ ঠিক কেন ঘুমায়। আধ্যাত্মিক গুরুরা একে বলেন ক্ষুদ্র মৃত্যু। চেতন থেকে অবচেতনের এই যাত্রা এক অদ্ভুত রহস্য। আর সেই ঘুমের পেটের ভেতর লুকিয়ে থাকা স্বপ্নের জগৎ? সে তো রহস্যের গর্ভে আরেক রহস্য! অবচেতন মন কখনো কখনো নিজের মতো করে এক সমান্তরাল জগৎ তৈরি করে নেয়। মানুষ ঘুমের ঘোরে এমন জায়গায় চলে যায়, বাস্তবে যার অস্তিত্ব ঠিকই আছে অথচ সে জীবনেও সেখানে পা রাখেনি। দিনের আলোয় যে জটিল গাণিতিক সমীকরণ বা জীবনের জট মেলানো যায়নি, স্বপ্নের ঘোরে অবলীলায় তার সমাধান মিলে যায়। আবার এই ঘুমই কারও কারও জন্য অভিশাপ, চোখ বন্ধ করলেই এক আদিম, অন্ধকার ভয়, কোনো এক অসহনীয় দুঃস্বপ্ন তাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। মানুষ কেন স্বপ্ন দেখে বিজ্ঞানের কাছে হয়তো যৌক্তিক ব্যাখ্যা আছে, কিন্তু দিনশেষে এ এক অজানা রহস্য।
ঘুমের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর আর সবচেয়ে অসহায় মানুষটি একদম সমান, দুজনেই নিষ্পাপ, দুজনেই ক্ষমতাহীন। কেউ মরার মতো একটু শান্তির ঘুমের জন্য সারারাত ছটফট করেন, আবার কেউ চোখ বুজলেই অনায়াসে তলিয়ে যান। একটু ভেবে দেখুন তো, আমরা কি আসলেই নিজের ইচ্ছায় ঘুমাই? নাকি ঘুম নামের এক অদৃশ্য শক্তি এসে আমাদের গ্রাস করে? আমরা চাইলেই তো আর অনন্তকাল জেগে থাকতে পারি না। প্রকৃতির সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখানেই। আলোর বিপরীতে যেমন অন্ধকার, সচেতনার বিপরীতে যেমন অচেতনতা, ঠিক তেমনি জেগে থাকার বিপরীতে ঘুম, আর জীবনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে মৃত্যু। এই চক্রটি আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় সবকিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। কোনো এক অসীম শক্তি নীরবে এই অস্তিত্বের চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করছেন, আর আমরা প্রতি রাতে চোখ বন্ধ করে নিঃশর্তে সেই মহাশক্তির কাছেই নিজেদের সঁপে দিই।
